আব্দুর গনী
রাতটা শুরু হয়েছিল অস্বাভাবিক নীরবতায়। ঢাকা শহর সাধারণত এমন চুপচাপ থাকে না, কিন্তু সেদিন যেন বাতাসেও একটা অজানা চাপা উত্তেজনা ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের ছোট্ট ঘরে বসে রাশেদ বই খুলে রেখেছিল ঠিকই, কিন্তু তার চোখ বারবার জানালার দিকে চলে যাচ্ছিল। বাইরে তাকালে মনে হচ্ছিল শহরটা যেন অপেক্ষা করছে-কিসের জন্য, তা কেউ জানে না।
তার বন্ধু কামাল বিছানার পাশে বসে ছিল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে বলল, “তোর কি মনে হচ্ছে না, কিছু একটা হবে?”রাশেদ সরাসরি উত্তর দিল না, তবে তার মুখের ভাবই সব বলে দিচ্ছিল। দুজনেই বুঝতে পারছিল-রাতটা স্বাভাবিক না।
হঠাৎ দূরে একটা ভারী শব্দ শোনা গেল। প্রথমে মনে হলো হয়তো কোনো ট্রাক, কিন্তু তারপর আরেকটা শব্দ, তারপর আরও কয়েকটা। মুহূর্তের মধ্যে সেই শব্দগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠল-মেশিনগানের গুলি। সঙ্গে সঙ্গেই হলের ভেতরে বিশৃঙ্খলা শুরু হয়ে গেল। কেউ দৌড়াচ্ছে, কেউ দরজা বন্ধ করছে, কেউ চিৎকার করে অন্যদের সতর্ক করছে।
রাশেদ আর কামাল উঠে দাঁড়াতেই দরজায় জোরে ধাক্কার শব্দ হলো। তারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই দরজাটা ভেঙে ভেতরে ঢ়ুকে পড়ল সশস্ত্র সৈন্যরা। সবকিছু ঘটে গেল কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। কোনো সতর্কতা, কোনো কথা নয়-শুধু গুলির শব্দ। কামাল কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু সে আর কথা শেষ করতে পারেনি।
সেই মুহূর্তে রাশেদের মাথায় আর কিছু কাজ করছিল না। সে শুধু দৌড়াতে শুরু করল। করিডোর পেরিয়ে, সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে, যেভাবে পারল বাইরে বের হয়ে এল। পেছনে তাকানোর সাহস তার হয়নি।
বাইরে এসে সে থেমে গেল এক মুহূর্তের জন্য। চারপাশে আগুন জ্বলছে। যে ক্যাম্পাসে সে প্রতিদিন হাঁটত, সেটাই এখন এক অচেনা যুদ্ধক্ষেত্র। ধোঁয়ায় আকাশ ঢেকে গেছে, আর মানুষের আর্তনাদ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। কোথাও কেউ দৌড়াচ্ছে, কোথাও কেউ পড়ে আছে-নড়ছে না।
রাস্তায় নামতেই সে হোঁচট খেল। নিচে তাকিয়ে সে দেখল-কামাল পড়ে আছে। চোখ খোলা, কিন্তু নিঃশব্দ। রাশেদের ভেতরটা কেঁপে উঠল, কিন্তু সে জানত এখানে থেমে থাকা মানে নিজের মৃত্যু ডেকে আনা। সে ধীরে ধীরে পেছনে সরে গিয়ে আবার দৌড় দিল।
সারা রাত ধরে শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে গুলির শব্দ আর আগুনের আলো ভেসে আসছিল। রাশেদ শেষ পর্যন্ত একটা অন্ধকার গলিতে আশ্রয় নেয়। সেখানে আরও কয়েকজন মানুষ ছিল-সবাই আতঙ্কিত, কিন্তু কেউ কথা বলছিল না। এক বৃদ্ধ ধীরে জিজ্ঞেস করলেন, “কি হচ্ছে এগুলো?”কিন্তু কেউ উত্তর দিতে পারল না। কারণ কেউই পুরোটা বুঝে উঠতে পারছিল না-শুধু জানত, কিছু ভয়াবহ ঘটছে।
ভোরের দিকে শব্দ কিছুটা কমে এলো। রাশেদ যখন গলি থেকে বের হলো, তখন ঢাকা শহরকে আর আগের মতো লাগছিল না। রাস্তায় পোড়া গন্ধ, ভাঙা জিনিসপত্র, আর ছড়িয়ে থাকা নিথর দেহ-সবকিছুই বলে দিচ্ছিল, এক রাতেই শহরটা বদলে গেছে।
সেদিন রাশেদ আর শহরে থাকেনি। সে চলে গিয়েছিল, কিন্তু সেই রাত তার ভেতর থেকে যায়।
অনেক বছর পরে সে আবার ফিরে আসে ঢাকায়। এখন এটি একটি স্বাধীন দেশের রাজধানী। নতুন ভবন, নতুন রাস্তা, নতুন জীবন-সবকিছু বদলে গেছে। কিন্তু রাশেদের কাছে শহরটা এখনো সেই রাতের মধ্যেই আটকে আছে।
সে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে কামালের মুখ, সেই রাতের আগুন, আর গুলির শব্দ। ঠিক তখন পাশ থেকে একটি ছোট ছেলে জিজ্ঞেস করে, “চাচা, আপনি এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?’’
রাশেদ একটু থেমে শান্তভাবে উত্তর দেয়, “একটা রাতের কথা মনে করতে।”
ছেলেটা বুঝতে পারে না, কিন্তু রাশেদ জানে-২৫শে মার্চের সেই রাত শুধু একটি রাত ছিল না। এটি ছিল এমন এক ঘটনা, যা একটি শহর, একটি প্রজন্ম, আর একটি জাতির ইতিহাস চিরতরে বদলে দিয়েছে।