Dhaka ০৮:২০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬, ২২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খেলাপি ঋণের ছায়া নিয়েই সংসদে ১১ এমপি

  • Reporter Name
  • Update Time : ১২:০৬:২৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩৪ Time View

উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়া অন্তত ৪৫ জন ঋণখেলাপি প্রার্থীর মধ্যে ১১ জন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন। তারা সবাই বিএনপি থেকে নির্বাচিত। তবে চট্টগ্রাম ২ ও চট্টগ্রাম ৪ আসনের দুজনের ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণসংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশ করেনি নির্বাচন কমিশন। শপথ অনুষ্ঠানেও তারা আমন্ত্রণ পাননি।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, ঋণখেলাপি কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না। সংশোধিত আরপিওতে বলা হয়েছে, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরও যদি কারও ঋণখেলাপি থাকার প্রমাণ পাওয়া যায় বা হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দেওয়া হয়, তাহলে নির্বাচন কমিশন তার সদস্যপদ বাতিল করতে পারে। ফলে যেসব প্রার্থী উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, সেই স্থগিতাদেশ উঠে গেলে তাদের এমপি পদও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। অবশ্য পুনঃতপশিলের মাধ্যমে ঋণ নিয়মিত করলে বা আদালত স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ালে সাময়িকভাবে তারা স্বস্তিতে থাকবেন।

মনোনয়নপত্র জমার শেষ তারিখ ছিল ২৯ ডিসেম্বর। ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরো নির্বাচন কমিশনে দুটি তালিকা পাঠায়। একটিতে ৮২ জনকে ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অন্যটিতে ৩১ জনের নাম ছিল, যারা উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়েছিলেন। পরে আপিল ও আদালতের আদেশে আরও ১৫ জন প্রার্থিতা ফিরে পান। সব প্রক্রিয়া শেষে ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ করে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হয়।

এর আগে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ঋণখেলাপিদের সুযোগ দেওয়া হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর তপশিল ঘোষণার আগে বলেছিলেন, আদালতের স্থগিতাদেশ নিলেও সিআইবিতে খেলাপি দেখানো হবে। তবে আইন পরিবর্তন না হওয়ায় তা কার্যকর হয়নি। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ আগস্টে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, “নির্বাচনে ঋণখেলাপিরা অংশ নিতে পারবেন না। নির্বাচন কমিশনের উচিত তাদের শনাক্ত করা।” কিন্তু নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ মন্তব্য করেন, “আমরা ঋণখেলাপি যাদের ছাড় দিয়েছি, মনে কষ্ট নিয়ে দিয়েছি। শুধু আইন তাদের পারমিট করেছে বিধায়।”

সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, প্রার্থিতা বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তবে তিনি প্রশ্ন তোলেন, “আদালত কি তাহলে যারা নির্বাচনে অংশ নেওয়ারই যোগ্য নয়, তাদের বিজয়ী হওয়ার সুযোগ করে দিলেন?” তার মতে, এতে জয় পরাজয়ের সমীকরণ বদলে গেছে।

চট্টগ্রাম ২ আসনে বিএনপির সারোয়ার আলমগীর ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৫৪৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মোহাম্মদ নুরুল আমিন পান ৬২ হাজার ১৬০ ভোট। উচ্চ আদালতের আদেশে তিনি নির্বাচনে অংশ নিলেও আপিল বিভাগে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ফল প্রকাশ স্থগিত রয়েছে।

চট্টগ্রাম ৪ আসনে মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী ১ লাখ ৪২ হাজার ৬৭৪ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আনোয়ার ছিদ্দিক চৌধুরী পান ৮৯ হাজার ২৬৮ ভোট। তার ক্ষেত্রেও আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ফল স্থগিত রাখা হয়েছে। মনোনয়ন বৈধ ঘোষণার সময় নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ তাকে বলেন, “মনোনয়নপত্র বৈধ করলাম। ব্যাংকের টাকাটা দিয়ে দিয়েন।”

এ ছাড়া চট্টগ্রাম ৬, কুমিল্লা ১০, কুমিল্লা ৯, বগুড়া ১, বগুড়া ৫, টাঙ্গাইল ৪, ময়মনসিংহ ৫, মৌলভীবাজার ৪ ও সিলেট ১ আসনের নির্বাচিতদের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন মেয়াদে স্থগিতাদেশ রয়েছে। কারও ক্ষেত্রে আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত, কারও ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট তারিখ পর্যন্ত স্থগিতাদেশ কার্যকর।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “আইনের চোখে সব নাগরিক সমান। অথচ ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতাদের অনেক সময় জেলে যেতে দেখা যায়। আর প্রভাবশালীরা আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন। এভাবে চলতে থাকলে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশা ব্যাহত হবে।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচন করা একটি সাময়িক সমাধান। স্থায়ী সমাধানের জন্য ঋণ পরিশোধ বা পুনঃতপশিলের মাধ্যমে নিয়মিত করা প্রয়োজন।” তিনি আশা প্রকাশ করেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংসদে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকবেন।

ঋণখেলাপি প্রার্থীদের বিজয় এবং আইনি অনিশ্চয়তা মিলিয়ে নতুন সংসদের শুরুতেই তৈরি হয়েছে বিতর্ক ও প্রশ্নের আবহ।

Tag :
About Author Information

খেলাপি ঋণের ছায়া নিয়েই সংসদে ১১ এমপি

Update Time : ১২:০৬:২৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়া অন্তত ৪৫ জন ঋণখেলাপি প্রার্থীর মধ্যে ১১ জন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন। তারা সবাই বিএনপি থেকে নির্বাচিত। তবে চট্টগ্রাম ২ ও চট্টগ্রাম ৪ আসনের দুজনের ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণসংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশ করেনি নির্বাচন কমিশন। শপথ অনুষ্ঠানেও তারা আমন্ত্রণ পাননি।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, ঋণখেলাপি কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না। সংশোধিত আরপিওতে বলা হয়েছে, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরও যদি কারও ঋণখেলাপি থাকার প্রমাণ পাওয়া যায় বা হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দেওয়া হয়, তাহলে নির্বাচন কমিশন তার সদস্যপদ বাতিল করতে পারে। ফলে যেসব প্রার্থী উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, সেই স্থগিতাদেশ উঠে গেলে তাদের এমপি পদও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। অবশ্য পুনঃতপশিলের মাধ্যমে ঋণ নিয়মিত করলে বা আদালত স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ালে সাময়িকভাবে তারা স্বস্তিতে থাকবেন।

মনোনয়নপত্র জমার শেষ তারিখ ছিল ২৯ ডিসেম্বর। ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরো নির্বাচন কমিশনে দুটি তালিকা পাঠায়। একটিতে ৮২ জনকে ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অন্যটিতে ৩১ জনের নাম ছিল, যারা উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়েছিলেন। পরে আপিল ও আদালতের আদেশে আরও ১৫ জন প্রার্থিতা ফিরে পান। সব প্রক্রিয়া শেষে ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ করে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হয়।

এর আগে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ঋণখেলাপিদের সুযোগ দেওয়া হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর তপশিল ঘোষণার আগে বলেছিলেন, আদালতের স্থগিতাদেশ নিলেও সিআইবিতে খেলাপি দেখানো হবে। তবে আইন পরিবর্তন না হওয়ায় তা কার্যকর হয়নি। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ আগস্টে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, “নির্বাচনে ঋণখেলাপিরা অংশ নিতে পারবেন না। নির্বাচন কমিশনের উচিত তাদের শনাক্ত করা।” কিন্তু নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ মন্তব্য করেন, “আমরা ঋণখেলাপি যাদের ছাড় দিয়েছি, মনে কষ্ট নিয়ে দিয়েছি। শুধু আইন তাদের পারমিট করেছে বিধায়।”

সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, প্রার্থিতা বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তবে তিনি প্রশ্ন তোলেন, “আদালত কি তাহলে যারা নির্বাচনে অংশ নেওয়ারই যোগ্য নয়, তাদের বিজয়ী হওয়ার সুযোগ করে দিলেন?” তার মতে, এতে জয় পরাজয়ের সমীকরণ বদলে গেছে।

চট্টগ্রাম ২ আসনে বিএনপির সারোয়ার আলমগীর ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৫৪৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মোহাম্মদ নুরুল আমিন পান ৬২ হাজার ১৬০ ভোট। উচ্চ আদালতের আদেশে তিনি নির্বাচনে অংশ নিলেও আপিল বিভাগে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ফল প্রকাশ স্থগিত রয়েছে।

চট্টগ্রাম ৪ আসনে মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী ১ লাখ ৪২ হাজার ৬৭৪ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আনোয়ার ছিদ্দিক চৌধুরী পান ৮৯ হাজার ২৬৮ ভোট। তার ক্ষেত্রেও আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ফল স্থগিত রাখা হয়েছে। মনোনয়ন বৈধ ঘোষণার সময় নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ তাকে বলেন, “মনোনয়নপত্র বৈধ করলাম। ব্যাংকের টাকাটা দিয়ে দিয়েন।”

এ ছাড়া চট্টগ্রাম ৬, কুমিল্লা ১০, কুমিল্লা ৯, বগুড়া ১, বগুড়া ৫, টাঙ্গাইল ৪, ময়মনসিংহ ৫, মৌলভীবাজার ৪ ও সিলেট ১ আসনের নির্বাচিতদের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন মেয়াদে স্থগিতাদেশ রয়েছে। কারও ক্ষেত্রে আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত, কারও ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট তারিখ পর্যন্ত স্থগিতাদেশ কার্যকর।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “আইনের চোখে সব নাগরিক সমান। অথচ ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতাদের অনেক সময় জেলে যেতে দেখা যায়। আর প্রভাবশালীরা আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন। এভাবে চলতে থাকলে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশা ব্যাহত হবে।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচন করা একটি সাময়িক সমাধান। স্থায়ী সমাধানের জন্য ঋণ পরিশোধ বা পুনঃতপশিলের মাধ্যমে নিয়মিত করা প্রয়োজন।” তিনি আশা প্রকাশ করেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংসদে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকবেন।

ঋণখেলাপি প্রার্থীদের বিজয় এবং আইনি অনিশ্চয়তা মিলিয়ে নতুন সংসদের শুরুতেই তৈরি হয়েছে বিতর্ক ও প্রশ্নের আবহ।