চট্টগ্রাম বন্দরে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি ঘিরে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। শ্রমিক-কর্মচারীদের আন্দোলনের মধ্যে ছয় জনকে ডিবি পরিচয়ে তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে বন্দর কার্যক্রম কার্যত বন্ধ থাকার দাবি করেছেন আন্দোলনকারীরা। তবে বন্দর চেয়ারম্যান বলছেন, বন্দর সচল আছে এবং কেউ কাজ করতে বাধা দিচ্ছে না।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের অভিযোগ, শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) রাত থেকে রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) সকাল পর্যন্ত বন্দর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ডিবি পরিচয়ে ছয় জন শ্রমিক-কর্মচারীকে তুলে নেওয়া হয়েছে। সংগঠনটির সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন জানান, সংগ্রাম পরিষদের দুজন প্রবীণ নেতাসহ মোট ছয় জনকে তুলে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “বন্দর চেয়ারম্যান শক্তি প্রয়োগ করে আন্দোলন দমন করতে চাইছেন। আলোচনা ছাড়া শক্তি প্রয়োগ করে আন্দোলন দমানো যাবে না। শক্তি প্রয়োগ হলে আরও কঠিন আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।”
তার ভাষ্য অনুযায়ী, তুলে নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন আবুল কালাম, শামসুল মিয়া টুকু, রিপন ও আসাদুল। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে এ অভিযোগ স্বীকার করা হয়নি।
এর মধ্যেই রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে চার দফা দাবিতে শ্রমিক-কর্মচারীরা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে যান। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে শুরু হওয়া এই কর্মসূচিতে শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ সমর্থন দেয়। আন্দোলনকারীদের দাবি, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আগের কর্মসূচির সময় নৌ পরিবহন উপদেষ্টার দেওয়া আশ্বাস বাস্তবায়ন না হওয়ায় তারা আবার কর্মবিরতিতে নামতে বাধ্য হয়েছেন।
বন্দর সূত্র জানায়, কর্মবিরতির কারণে জেটি, টার্মিনাল, কনটেইনার ডিপো ও বহির্নোঙরসহ বন্দরের সব স্থানে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। সকাল থেকে কোনো কনটেইনারবাহী যানবাহন বন্দরে প্রবেশ বা বের হতে দেখা যায়নি। বন্দরের বিভিন্ন গেটে অতিরিক্ত পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়।
এই অবস্থার মধ্যেই রোববার বেলা সোয়া ১২টার দিকে বন্দর ভবনের সামনে সংবাদ সম্মেলনে এসে চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান দাবি করেন, বন্দর সচল আছে। তিনি বলেন, “বন্দরকে হাইজ্যাক করে জনগণকে জিম্মি করে কিছু বিপথগামী কর্মচারী এই পথ বেছে নিয়েছে।” তার মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কাজ করে কেউ অন্য কারো আনুগত্য বেছে নিতে পারে না।
তিনি আরও বলেন, “বন্দর সচল আছে। আমি দুই ঘণ্টা ধরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা সবাই কাজে যাবে, কেউ বাধা দেবে না।” তবে দুপুরের দিকে বন্দর ভবনের সামনে ও এনসিটি গেটে গিয়ে কোনো যানবাহন চলাচল দেখা যায়নি।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এনসিটি পরিচালনার চুক্তি প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে বন্দর চেয়ারম্যান জানান, এ বিষয়ে আলোচনা বা নেগোসিয়েশন এখনো শেষ হয়নি।
আন্দোলনকারীরা অবশ্য চেয়ারম্যানের বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন বলেন, “সকাল থেকেই আমাদের ধর্মঘট চলছে। কোথাও কোনো কাজ হচ্ছে না। শ্রমিক-কর্মচারীরা শতভাগ সমর্থন দিয়ে কাজে যোগ দেননি।” তিনি অভিযোগ করেন, আন্দোলন দমাতে প্রশাসন ভিন্ন পথ বেছে নিচ্ছে এবং বন্দর এলাকায় বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
এর আগে শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে চার দফা দাবিতে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির ঘোষণা দেন সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ও বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের নেতা মো. হুমায়ুন কবীর। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়া বাতিল, বদলি আদেশ প্রত্যাহার, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা না করা এবং বন্দর চেয়ারম্যানকে প্রত্যাহার।
সব মিলিয়ে, শ্রমিকদের আন্দোলন, তুলে নেওয়ার অভিযোগ এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের পাল্টা দাবির মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বন্দর সচল না অচল, সে প্রশ্নে দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট ভিন্নতা থাকলেও বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম যে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের উদ্বেগ বাড়ছে।