লাগাতার কর্মবিরতির কারণে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম কার্যত থমকে গেছে। পণ্য ওঠানামা বন্ধ, জাহাজ চলাচল স্থবির এবং রপ্তানি-আমদানির চাকা আটকে যাওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ী ও শিল্পখাতের প্রতিনিধিরা। তাঁরা বলছেন, এই অচলাবস্থা দীর্ঘ হলে অর্থনীতি, ভোক্তা বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির ষষ্ঠ দিনে বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকেও বন্দরে কোনো ধরনের অপারেশন চালু হয়নি। গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ সব হ্যান্ডলিং যন্ত্রপাতি বন্ধ থাকায় নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল, চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল ও জেনারেল কার্গো বার্থ পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ে। নতুন কোনো জাহাজ জেটিতে ভিড়তে না পারায় বুধবার পর্যন্ত বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ জাহাজের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৬টিতে।
এই কর্মবিরতির সূত্রপাত হয় নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে। শ্রমিক ও কর্মচারীরা প্রথমে ৩১ জানুয়ারি থেকে ধাপে ধাপে কর্মবিরতি পালন করেন। পরে মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে ২৪ ঘণ্টার কর্মসূচি শুরু হয়ে তা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে রূপ নেয়।
বন্দর ব্যবহাকারীদের উদ্বেগের কথা উঠে আসে বুধবার সন্ধ্যায় নগরীর আগ্রাবাদে একটি হোটেলে আয়োজিত বৈঠকে। বৈঠক শেষে বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি এমএ সালাম সাংবাদিকদের বলেন, “সামনে নির্বাচন, তিন দিনের ছুটি। এর সাত-আট দিন পরেই রমজান। রমজানের পণ্যগুলো কীভাবে ডেলিভারি হবে, সেটাই আমাদের বড় দুশ্চিন্তা।” তিনি জানান, ফেব্রুয়ারি ও মার্চে কর্মদিবস কম থাকায় গার্মেন্টসসহ উৎপাদন খাত মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে।
এমএ সালাম আরও বলেন, “বন্দর এভাবে বন্ধ থাকলে বাড়তি চার্জের সব চাপ ব্যবসার ওপর আসবে, আর শেষ পর্যন্ত সেই চাপ পড়বে ভোক্তার ঘাড়ে।” তাঁর মতে, আগে এক-দুদিন বন্দর বন্ধ হলেও জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়নি। “কিন্তু এবার প্রথমবার জাহাজ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সবাই বিষয়টি লক্ষ্য করছে, এটা আমাদের জন্য সুনাম নয়, বরং দুর্নাম বয়ে আনছে।”
আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহীম খোকন বলেন, কর্মবিরতি অনির্দিষ্টকালের জন্য চলবে। তাঁর ভাষায়, “যতক্ষণ পর্যন্ত সরকার এনসিটি বেসরকারিকরণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে না আসবে এবং শ্রমিক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে নেওয়া বদলি ও অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহার না করবে, ততক্ষণ আলোচনা ছাড়া সমাধানের সুযোগ নেই।”
বন্দর অচল থাকায় রপ্তানি ও আমদানির সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানায়। বন্দরসংশ্লিষ্ট ডিপো মালিকদের সংগঠন বিকডার তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১১ হাজার রপ্তানি কনটেইনার বিভিন্ন ডিপোতে আটকে আছে। অন্যদিকে আমদানি কনটেইনার খালাস না হওয়ায় কাঁচামালের সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, “দেশের ৯০ শতাংশের বেশি আমদানি-রপ্তানি চট্টগ্রাম বন্দরনির্ভর। বন্দর অচল থাকলে দেশের অর্থনীতি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে।”
ব্যবসায়ী ও শ্রমিক উভয় পক্ষই দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানালেও এখনো সরকারিভাবে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না আসায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।