চব্বিশের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান চলাকালে আশুলিয়ায় ছয়জনের লাশ পোড়ানোসহ সাতজনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ছয় আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। একই মামলায় নয় আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একজন আসামিকে খালাস দিয়েছেন আদালত।
এই রায় ঘোষণা করা হয় বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল রায় দেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা-১৯ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। তার সঙ্গে আশুলিয়া থানার তৎকালীন ওসি এএফএম সায়েদ রনি, সাবেক এসআই আবদুল মালেক, সাবেক এএসআই বিশ্বজিৎ সাহা, কনস্টেবল মুকুল চৌধুরী এবং স্থানীয় যুবলীগ নেতা রনি ভূঁইয়াকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আদালত একই সঙ্গে সাবেক এমপি সাইফুল ইসলামের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে বিতরণের নির্দেশ দিয়েছেন।
এ মামলায় সাত আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সাবেক পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান রিপন, ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আব্দুল্লাহিল কাফী, সাভার সার্কেলের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শাহিদুল ইসলাম, গোয়েন্দা পুলিশের তৎকালীন পরিদর্শক আরাফাত হোসেন, সাবেক পুলিশ পরিদর্শক নির্মল কুমার দাস এবং সাবেক পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান। এছাড়া এসআই আরাফাত উদ্দিন ও এএসআই কামরুল হাসানকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আদালত আশুলিয়া থানার সাবেক এসআই শেখ আবজালুল হককে খালাস দেন। তিনি দোষ স্বীকার করে রাজসাক্ষী হিসেবে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছিলেন।
রায় ঘোষণার সময় মামলায় গ্রেপ্তার আট আসামিকে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় হাজির করা হয়। বেলা ১২টা ২৫ মিনিটে তাদের উপস্থিতিতেই সংক্ষিপ্ত রায় পাঠ করেন বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। রায় ঘিরে ট্রাইব্যুনাল ও সুপ্রিম কোর্ট এলাকায় কয়েক স্তরের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। পুলিশ, র্যাব, বিজিবির পাশাপাশি মোতায়েন ছিল সেনাবাহিনী।
মামলার বিবরণে উঠে আসে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাভারের আশুলিয়ায় পুলিশের গুলিতে ছয়জন তরুণ নিহত হন। পরে তাদের মরদেহ একটি পুলিশ ভ্যানে তুলে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। নৃশংস এই ঘটনায় একজন তখনও জীবিত ছিলেন। তাকেও পেট্রল ঢেলে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। এর আগের দিন আরও একজন আন্দোলনকারী নিহত হন। সব মিলিয়ে সাতজন এই ঘটনায় শহীদ হন।
এই ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করা হয়। প্রসিকিউশনের দেওয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগের সঙ্গে ৩১৩ পৃষ্ঠার নথি, ১৬৮ পৃষ্ঠার দালিলিক প্রমাণ এবং দুটি পেনড্রাইভ যুক্ত করা হয়। সাক্ষী করা হয় ৬২ জনকে।
গত বছরের ২১ আগস্ট ট্রাইব্যুনাল-২ মামলার অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে বৃহস্পতিবার ঘোষিত এই রায়ের মধ্য দিয়ে আশুলিয়ার লাশ পোড়ানোর ঘটনায় বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শেষ হলো।