বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬, ০৬:৪৭ অপরাহ্ন
Notice :
Wellcome to our website...

কারা হেফাজতে মৃত্যু বন্ধ হচ্ছে না

প্রতিনিধি: / ৭ দেখেছেন:
পাবলিশ: বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ, ২০২৬

বাংলাদেশে কারা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা বহু বছর ধরেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের আলোচনায় রয়েছে। ক্ষমতার পালাবদল হলেও এই চিত্রের কোনো মৌলিক পরিবর্তন হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কারাগারে মৃত্যুর সংখ্যা তো কমেইনি, বরং ২০২৫ সালে তা বেড়েছে। এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে, গণঅভ্যুত্থান শুধু ক্ষমতার কাঠামো বদলেছে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় সহিংসতার সংস্কৃতি ভাঙতে পারেনি। কারা অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে কারা হেফাজতে ১৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০২৩ সালে মৃত্যু হয়েছে ১৫৫ জনের, ২০২৪ সালে ১২০ জনের এবং ২০২৫ সালে মৃত্যু হয়েছে ১৭২ জন বন্দির। চার বছরে মোট ৬৩২ জন বন্দি কারাগারে মারা গেছেন। এর মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনাও রয়েছে- ২০২৫ সালে ছয়জন বন্দি আত্মহত্যা করেছেন। ২০২৪ সালে তিনজন, ২০২৩ সালে দুজন এবং ২০২২ সালে চারজন বন্দি আত্মহত্যা করেছিলেন। অর্থাৎ পাঁচ বছরে মোট ১৯ জন বন্দি আত্মহত্যা করেছেন। কারা কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, বন্দিদের চিকিৎসায় অবহেলার সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, চিকিৎসক সংকট, অ্যাম্বুলেন্স সংকট এবং অব্যবস্থাপনার কারণে বন্দিদের মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। দেশের ৭৫টি কারাগারে মাত্র ২৭টি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। বেশিরভাগ কারাগারে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক নেই। ফলে গুরুতর অসুস্থ বন্দিদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয় না। অনেক সময় পথে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। একজন কারা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রাতের বেলায় চিকিৎসক পাওয়া যায় না। কোনো কোনো কারাগারে অ্যাম্বুল্যান্স না থাকায় গুরুতর রোগীকে দ্রুত বাইরের হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে অনেক বন্দি পথেই মারা যান। অন্যদিকে, নিহত পরিবারগুলোর অভিযোগ, চিকিৎসায় অবহেলার কারণে তাদের স্বজন মারা গেছেন। ঢামেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অবশ্য দাবি করছে, কারাগার থেকে আসা বন্দিদের চিকিৎসায় অবহেলার সুযোগ নেই। কিন্তু পরিবারগুলো বলছে, কারাগারে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হয় না, অনেক সময় অসুস্থতার খবরও তাদের জানানো হয় না। সূত্রমতে, ২০২৫ সালের শুরুতে একাধিক আওয়ামী লীগ নেতা কারা হেফাজতে মারা গেছেন। সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। জানুয়ারিতে পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক প্রলয় চাকী, নারায়ণগঞ্জের হুমায়ুন কবির, মেহেরপুরের গোলাম মোস্তফা এবং চট্টগ্রামের আবদুর রহমান মিয়া কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন। কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা সবাই হৃদরোগ, ডায়াবেটিস বা বার্ধক্যজনিত জটিলতায় ভুগছিলেন। তবে পরিবারগুলোর অভিযোগ, যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়ায় তাদের মৃত্যু হয়েছে। এদিকে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, কারাবন্দি এসব আওয়ামী লীগ নেতাদের আইনগত প্রক্রিয়ায় জামিনের জন্য বহুবার আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন তাদের পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তারা জামিন পাননি। সাবেক শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন গুরুতর অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও জামিন পাননি। একইভাবে চট্টগ্রামের আবদুর রহমান মিয়া ক্যানসারে ভুগছিলেন, কিন্তু আদালত তাকে জামিন দেয়নি। পরিবারগুলোর অভিযোগ, রাজনৈতিক বিবেচনায় তাদের আটকে রাখা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন বলেছেন, অভ্যুত্থানের পরও মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। নতুন সরকারও পুরনো সংস্কৃতি ভাঙতে পারেনি। আন্তর্জাতিক সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে গুম ও দমন-পীড়নের সংস্কৃতি ছিল, কিন্তু বিগত অন্তর্বর্তী সরকারও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্বিচারে আটক করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কারা হেফাজতে মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনা রাষ্ট্রের জবাবদিহি দাবি করে। একজন নাগরিক একবার রাষ্ট্রের হেফাজতে গেলে তার নিরাপত্তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর বর্তায়। প্রকৃত পরিবর্তন চাইলে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি স্বাধীন তদন্ত, স্বচ্ছতা এবং দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, সরকার পাল্টালেও কারা হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা কমেনি, বরং বেড়েছে। রাষ্ট্রীয় হেফাজতে মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনা এখন শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নয়, বরং রাষ্ট্রের জবাবদিহি ও নৈতিকতার বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙতে না পারলে কারাগার কখনোই মানুষের জন্য নিরাপদ স্থান হয়ে উঠবে না হবে না বলে মনে করছেন মানবাধিকার রক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।


এই বিভাগের আরো খবর