বাঙালি মুসলমান নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার কল্পনাজগত এবার বড় পর্দায় বাংলাদেশের দর্শকের সামনে আসছে। তার ঐতিহাসিক উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র ‘সুলতানাস ড্রিম’ চলতি মাসেই দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়ার আভাস মিলেছে। বেগম রোকেয়ার বিখ্যাত উপন্যাস ‘সুলতানাস ড্রিম’ অবলম্বনে নির্মিত অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন স্প্যানিশ নির্মাতা ইসাবেল হারগুয়েরা। ২০২৩ সালে ছিয়াশি মিনিট দৈর্ঘ্যরে এই চলচ্চিত্রের প্রিমিয়ার হয় স্পেনের সান সেবাস্তিয়ান চলচ্চিত্র উৎসবে। একই বছর এটি স্পেনের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় এবং পরবর্তীতে ইউরোপীয় চলচ্চিত্র উৎসব, গোয়া চলচ্চিত্র উৎসব, হামবুর্গ ও লিডস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবসহ একাধিক আন্তর্জাতিক আয়োজনে প্রদর্শিত হয়ে প্রশংসা ও পুরস্কার অর্জন করে। এবার সেই বহুল আলোচিত চলচ্চিত্রটি আসছে বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহে। চলচ্চিত্রটির ট্রেলার প্রকাশের মাধ্যমে স্টার সিনেপ্লেঙ্ বাংলাদেশে মুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। যদিও নির্দিষ্ট তারিখ জানানো হয়নি, তবে চলতি জানুয়ারিতেই মুক্তির সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ২০১২ সালের দিকে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্দেশ্যে ভারতে যান ইসাবেল হারগুয়েরা। সে সময় দিল্লির একটি শিল্পকলা গ্যালারিতে তিনি হঠাৎ আবিষ্কার করেন বেগম রোকেয়ার লেখা ‘সুলতানাস ড্রিম’। বইয়ের প্রচ্ছদে এক নারীর মহাকাশযান চালানোর চিত্র তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। উপন্যাসটি পড়ে তিনি বিস্মিত হন। শত বছরেরও বেশি আগে লেখা এই কল্পকাহিনি আজও কতটা সময়োপযোগী। সেখান থেকেই বইটি নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। দীর্ঘ আট বছরের গবেষণা ও পরিশ্রমের পর নির্মিত হয় অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র ‘সুলতানাস ড্রিম’। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার উল্টো এক জগৎ উঠে এসেছে বইতে। সেখানে নারীরা সমাজের নেতৃত্বে এবং পুরুষেরা গৃহস্থালির দায়িত্বের ভাবনাকে পর্দায় তুলে ধরেছে চলচ্চিত্রটি। বেগম রোকেয়ার সেই সাহসী ও বিপ্লবী কল্পনার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই নির্মিত হয়েছে এই কাজ। স্পেন ও জার্মানির পাঁচটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে চলচ্চিত্রটি প্রযোজনা করেছে। এতে ব্যবহৃত হয়েছে বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, ইতালিয়ান, স্প্যানিশ ও বাস্কসহ মোট ছয়টি ভাষা। চলচ্চিত্রে রয়েছে বাঙালি সংগীতশিল্পী মৌসুমী ভৌমিকের লেখা গান। এর সংগীতায়োজন করেছেন তাজদির জুনায়েদ এবং কণ্ঠ দিয়েছেন দীপান্বিতা আচার্য। গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সফরে এসে ইসাবেল হারগুয়েরা বেগম রোকেয়ার জন্মভূমি পায়রাবন্দ পরিদর্শন করেন। পাশাপাশি রাজধানীর আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আয়োজিত ‘মাই এনকাউন্টার উইথ রোকেয়া’ শীর্ষক সেমিনারে অংশ নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তিনি। ইসাবেল হারগুয়েরা বলেন, বেগম রোকেয়া এক শতাব্দী আগে নারী ও পুরুষের প্রচলিত সামাজিক ভূমিকার বাইরে গিয়ে এক উল্টো বাস্তবতা কল্পনা করেছিলেন, যা সে সময় ছিল অত্যন্ত সাহসী ও বিপ্লবী। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও এমন দূরদর্শী ভাবনা তাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। তার মতে, ‘সুলতানাস ড্রিম’ আজও নীরবে নারীর চিন্তা ও আত্মবিশ্বাসকে পথ দেখিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে মুক্তির মাধ্যমে ‘সুলতানাস ড্রিম’ নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছে বেগম রোকেয়ার চিন্তা ও স্বপ্নকে নতুনভাবে তুলে ধরবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।