Dhaka ০৮:০৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৫ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

 ৮ শিক্ষকেই চলছে পাইকগাছা সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ; ঝুঁকিতে পুরো প্রজন্ম

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৩:৩৪:১৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬
  • ১৫ Time View

 পাইকগাছা (খুলনা) প্রতিনিধি : খুলনার পাইকগাছা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিনের শিক্ষক সংকট এখন চরম আকার ধারণ করেছে। ১৪টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৮ জন শিক্ষক। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে নিয়মিত শিক্ষক না থাকায় পাঠদান কার্যত ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এতে প্রায় ৩০০-এর বেশি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা দিয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা। প্রশ্ন উঠছে—এই শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা কোথায়?

বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গণিত, বাংলা, উচ্চতর গণিত, ইংরেজি, জীববিজ্ঞান ও রসায়ন বিষয়ে কোনো নিয়মিত শিক্ষক নেই। পদার্থবিজ্ঞানেও পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অধিকাংশ শূন্য পদ সৃষ্টি হয়েছে শিক্ষক অবসরের পর, কিন্তু দীর্ঘদিনেও নতুন নিয়োগ না হওয়ায় সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। এছাড়া চলতি এপ্রিলেই আরও একজন সহকারী শিক্ষক বি-এড প্রশিক্ষণে যাওয়ার কথা রয়েছে।

বর্তমানে একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক, একজন ব্যবসায় শিক্ষা শিক্ষক এবং কয়েকজন সিনিয়র ও সহকারী শিক্ষক দিয়ে কোনোভাবে পাঠদান চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একজন শিক্ষককে একাধিক বিষয় পড়াতে হওয়ায় শিক্ষার গুণগত মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

শুধু শিক্ষক নয়, প্রশাসনিক কাঠামোও ভেঙে পড়েছে। প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। নেই অফিস সহকারী, নৈশ প্রহরী ও আয়া। এমনকি ভাড়াটিয়া কর্মচারী দিয়ে অফিস ও কম্পিউটার সংক্রান্ত কাজ চালানো হচ্ছে।

শিক্ষার্থীরা জানায়, নিয়মিত ক্লাস না হওয়ায় তারা পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে। দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বলে, “গণিত ও বিজ্ঞান ঠিকমতো না হওয়ায় কিছুই বুঝতে পারছি না।” নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানায়, “একজন শিক্ষক একাধিক বিষয় পড়ালে পুরোটা আয়ত্ত করা সম্ভব হয় না।” অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বলে, “ইংরেজি ও বাংলা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, কোচিং ছাড়া উপায় নেই।”

অভিভাবকদের মাঝেও চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে। শিক্ষার্থীর অভিভাবক মো. আব্দুল হালিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এভাবে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না। বছরের পর বছর শিক্ষক না থাকায় আমাদের সন্তানরা মারাত্মকভাবে পিছিয়ে পড়ছে। শুধু পাশ করানোই যদি লক্ষ্য হয়, তাহলে মানসম্মত শিক্ষার জায়গা কোথায়?”

তিনি আরও বলেন, “অন্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে ক্লাস নেওয়ায় শিক্ষার্থীরা মূল বিষয়গুলো ঠিকভাবে বুঝতে পারছে না। এতে তাদের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব ভবিষ্যতে বোর্ড পরীক্ষা ও উচ্চশিক্ষায় পড়বে।”

স্থানীয় শিক্ষানুরাগী অ্যাডভোকেট আবু হানিফ সোহেল বলেন, “একটি বিদ্যালয়ে এভাবে দীর্ঘদিন শিক্ষক সংকট থাকা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দ্রুত সমাধান না হলে একটি প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল ওহাব বলেন, দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকায় স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাবে অন্য শিক্ষক দিয়ে ক্লাস নিতে হচ্ছে, যা শিক্ষার মানে প্রভাব ফেলছে।

তিনি জানান, “সীমিত জনবল নিয়ে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। তবে এভাবে দীর্ঘদিন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।” দ্রুত শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াসিজ্জামান চৌধুরী বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং দ্রুত সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা খুলনা অঞ্চলের উপ-পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. কামরুজ্জামান বলেন, “অবসরজনিত কারণে কয়েকটি পদ শূন্য হয়েছে। দ্রুত পদায়নের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। শিক্ষার্থীদের ক্ষতি কমাতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

বর্তমান বাস্তবতা বলছে—শিক্ষক সংকট এখন আর শুধু একটি বিদ্যালয়ের সমস্যা নয়, এটি ধীরে ধীরে একটি পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। দীর্ঘদিন ধরে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের ভিত্তি দুর্বল করে দিচ্ছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি বহন করতে হবে পুরো সমাজকেই।

Tag :
About Author Information

জনপ্রিয়

বাগেরহাটে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

 ৮ শিক্ষকেই চলছে পাইকগাছা সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ; ঝুঁকিতে পুরো প্রজন্ম

Update Time : ০৩:৩৪:১৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬

 পাইকগাছা (খুলনা) প্রতিনিধি : খুলনার পাইকগাছা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিনের শিক্ষক সংকট এখন চরম আকার ধারণ করেছে। ১৪টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৮ জন শিক্ষক। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে নিয়মিত শিক্ষক না থাকায় পাঠদান কার্যত ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এতে প্রায় ৩০০-এর বেশি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা দিয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা। প্রশ্ন উঠছে—এই শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা কোথায়?

বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গণিত, বাংলা, উচ্চতর গণিত, ইংরেজি, জীববিজ্ঞান ও রসায়ন বিষয়ে কোনো নিয়মিত শিক্ষক নেই। পদার্থবিজ্ঞানেও পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অধিকাংশ শূন্য পদ সৃষ্টি হয়েছে শিক্ষক অবসরের পর, কিন্তু দীর্ঘদিনেও নতুন নিয়োগ না হওয়ায় সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। এছাড়া চলতি এপ্রিলেই আরও একজন সহকারী শিক্ষক বি-এড প্রশিক্ষণে যাওয়ার কথা রয়েছে।

বর্তমানে একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক, একজন ব্যবসায় শিক্ষা শিক্ষক এবং কয়েকজন সিনিয়র ও সহকারী শিক্ষক দিয়ে কোনোভাবে পাঠদান চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একজন শিক্ষককে একাধিক বিষয় পড়াতে হওয়ায় শিক্ষার গুণগত মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

শুধু শিক্ষক নয়, প্রশাসনিক কাঠামোও ভেঙে পড়েছে। প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। নেই অফিস সহকারী, নৈশ প্রহরী ও আয়া। এমনকি ভাড়াটিয়া কর্মচারী দিয়ে অফিস ও কম্পিউটার সংক্রান্ত কাজ চালানো হচ্ছে।

শিক্ষার্থীরা জানায়, নিয়মিত ক্লাস না হওয়ায় তারা পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে। দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বলে, “গণিত ও বিজ্ঞান ঠিকমতো না হওয়ায় কিছুই বুঝতে পারছি না।” নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানায়, “একজন শিক্ষক একাধিক বিষয় পড়ালে পুরোটা আয়ত্ত করা সম্ভব হয় না।” অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বলে, “ইংরেজি ও বাংলা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, কোচিং ছাড়া উপায় নেই।”

অভিভাবকদের মাঝেও চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে। শিক্ষার্থীর অভিভাবক মো. আব্দুল হালিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এভাবে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না। বছরের পর বছর শিক্ষক না থাকায় আমাদের সন্তানরা মারাত্মকভাবে পিছিয়ে পড়ছে। শুধু পাশ করানোই যদি লক্ষ্য হয়, তাহলে মানসম্মত শিক্ষার জায়গা কোথায়?”

তিনি আরও বলেন, “অন্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে ক্লাস নেওয়ায় শিক্ষার্থীরা মূল বিষয়গুলো ঠিকভাবে বুঝতে পারছে না। এতে তাদের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব ভবিষ্যতে বোর্ড পরীক্ষা ও উচ্চশিক্ষায় পড়বে।”

স্থানীয় শিক্ষানুরাগী অ্যাডভোকেট আবু হানিফ সোহেল বলেন, “একটি বিদ্যালয়ে এভাবে দীর্ঘদিন শিক্ষক সংকট থাকা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দ্রুত সমাধান না হলে একটি প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল ওহাব বলেন, দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকায় স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাবে অন্য শিক্ষক দিয়ে ক্লাস নিতে হচ্ছে, যা শিক্ষার মানে প্রভাব ফেলছে।

তিনি জানান, “সীমিত জনবল নিয়ে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। তবে এভাবে দীর্ঘদিন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।” দ্রুত শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াসিজ্জামান চৌধুরী বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং দ্রুত সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা খুলনা অঞ্চলের উপ-পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. কামরুজ্জামান বলেন, “অবসরজনিত কারণে কয়েকটি পদ শূন্য হয়েছে। দ্রুত পদায়নের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। শিক্ষার্থীদের ক্ষতি কমাতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

বর্তমান বাস্তবতা বলছে—শিক্ষক সংকট এখন আর শুধু একটি বিদ্যালয়ের সমস্যা নয়, এটি ধীরে ধীরে একটি পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। দীর্ঘদিন ধরে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের ভিত্তি দুর্বল করে দিচ্ছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি বহন করতে হবে পুরো সমাজকেই।