Dhaka ০৬:১৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৫ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাগেরহাটে বউ বরণ নয়, একসঙ্গে ৯ স্বজনের জানাজা, সড়ক দুর্ঘটনায় নবদম্পতিসহ ১৪ জন নিহত, শোকে স্তব্ধ মোংলা

  • Reporter Name
  • Update Time : ১১:২৭:০০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬
  • ৩০ Time View
সৈয়দ শওকত হোসেন,,বাগেরহাট: যে উঠানে আজ নতুন বউকে বরণ করে নেওয়ার কথা ছিল, সেই উঠানেই সারি সারি খাটিয়া। ফুল, আলোর সাজসজ্জা আর আনন্দ ধ্বনির বদলে সেখানে ছিল নিথর দেহ আর স্বজনদের বুক‌ফাটা কান্না। একসঙ্গে পরিবারের ৯ সদস্যের মরদেহ দেখে স্তব্ধ হয়ে গেছে উপস্থিত মানুষজন।
মোংলা উপজেলার শেহালাবুনিয়ায় বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাকের বাড়িতে শুক্রবার (১৩ মার্চ) গভীর রাত থেকেই ভিড় করেন শত শত মানুষ। কেউ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে, কেউ চোখ মুছছেন, আবার কেউ কান্না থামাতে পারছেন না। বউ বরণের আনন্দের অপেক্ষা মুহূর্তেই রূপ নেয় একসঙ্গে ৯ স্বজনের শেষ বিদায়ে।
সবকিছু ঠিক থাকলে শুক্রবার সকালে গ্রাম বাংলার চিরাচরিত রীতিতে নতুন বর-বউকে ঘিরে খুনসুটি, খাওয়া-দাওয়া আর শিশুদের হৈ-হুল্লোড়ে মুখরিত থাকত বাড়িটি। কিন্তু একটি মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই নিভিয়ে দিয়েছে সেই আনন্দের আলো, ভেঙে দিয়েছে দুই পরিবারের অসংখ্য স্বপ্ন।
গত বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বিকেলে মোংলা-খুলনা মহাসড়কের রামপাল উপজেলার বেলাই ব্রিজ এলাকায় নৌবাহিনীর একটি স্টাফ বাসের সঙ্গে নববধূকে বহনকারী মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে মাইক্রোবাসের চালকসহ দুই পরিবারের ১৪ জন নিহত হন। আহত একজনকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
নিহতদের মধ্যে বর আহাদুর রহমান সাব্বির, তাঁর বাবা আব্দুর রাজ্জাক, ভাই আবদুল্লাহ সানি, বোন উম্মে সুমাইয়া (ঐশী), তাঁর শিশু ছেলে সামিউল ইসলাম ফাহিম, বড় ভাই আশরাফুল আলম (জনি)-এর স্ত্রী ফারহানা সিদ্দিকা (পুতুল) এবং তাঁদের সন্তান আলিফ, আরফা ও ইরাম রয়েছেন।
এ ছাড়া নিহত হয়েছেন কনে মার্জিয়া আক্তার (মিতু), তাঁর ছোট বোন লামিয়া আক্তার, দাদি রাশিদা বেগম ও নানি আনোয়ারা বেগম। নিহত মাইক্রোবাস চালক নাঈমের বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার পেড়িখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা।
পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদী ইউনিয়নের নাকসা গ্রামের বাসিন্দা আবদুস সালাম মোড়লের মেয়ে মার্জিয়া আক্তারের সঙ্গে বুধবার রাতে মোংলা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকের ছোট ছেলে আহাদুর রহমানের বিয়ে হয়।
কনের বাড়িতে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে বৃহস্পতিবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে বর পক্ষ নববধূকে নিয়ে মোংলার উদ্দেশে রওনা দেয়। কিন্তু বাড়ি থেকে আর কয়েক কিলোমিটার দূরে রামপাল উপজেলার বেলাই ব্রিজ এলাকায় বিপরীত দিক থেকে আসা নৌবাহিনীর একটি বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায় একটি নবদম্পতির স্বপ্নময় পথচলা।
পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর মধ্যে মোংলায় আনা হয় ৯টি মরদেহ, কয়রায় নেওয়া হয় ৪টি এবং রামপালে নেওয়া হয় মাইক্রোবাস চালকের মরদেহ।
শুক্রবার গভীর রাতে বরের পরিবারের ৯ সদস্যের মরদেহ মোংলার শেহালাবুনিয়ায় পৌঁছালে শুরু হয় হৃদয়বিদারক দৃশ্য। এক সঙ্গে এতগুলো মরদেহ দেখে অনেকেই কান্না ধরে রাখতে পারেননি।
প্রতিবেশী শরীফ হাবিবুর রহমান বলেন, এক সঙ্গে এতগুলো লাশ আমি জীবনে দেখিনি। এটা সহ্য করার মতো নয়।
নিহত আব্দুর রাজ্জাকের ছোট ভাই সাজ্জাদ সরদার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমাদের বেড়ে ওঠা মোংলাতেই। তবে গ্রামের বাড়ি কয়রায়। রাজ্জাক ভাই তাঁর মেয়েরও বিয়ে দিয়েছেন কয়রায়। এই ছেলেরও সেখানে বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু এক দুর্ঘটনায় পুরো পরিবারটাই শেষ হয়ে গেল।
তিনি জানান, আশপাশের নয়টি মসজিদ থেকে খাটিয়া আনা হয়। গোসল শেষে একে একে নয়জন স্বজনকে খাটিয়ায় শুইয়ে রাখা হয়।
শুক্রবার জুমার নামাজের পর মোংলা উপজেলা পরিষদ চত্বরে তাঁদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে মোংলা পৌর কবরস্থানে তাঁদের দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে।
বিয়ের সানাই বাজা বাড়িতে এখন শুধুই কান্নার রোল। মুহূর্তেই বিষাদের সাগরে ডুবে গেছে দুটি পরিবার। যে উঠানে আজ নতুন বউয়ের পা পড়ার কথা ছিল, সেই উঠানেই হলো স্বজনদের শেষ বিদায়। শোক আর অশ্রুতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।
Tag :
About Author Information

জনপ্রিয়

বাগেরহাটে বউ বরণ নয়, একসঙ্গে ৯ স্বজনের জানাজা, সড়ক দুর্ঘটনায় নবদম্পতিসহ ১৪ জন নিহত, শোকে স্তব্ধ মোংলা

Update Time : ১১:২৭:০০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬
সৈয়দ শওকত হোসেন,,বাগেরহাট: যে উঠানে আজ নতুন বউকে বরণ করে নেওয়ার কথা ছিল, সেই উঠানেই সারি সারি খাটিয়া। ফুল, আলোর সাজসজ্জা আর আনন্দ ধ্বনির বদলে সেখানে ছিল নিথর দেহ আর স্বজনদের বুক‌ফাটা কান্না। একসঙ্গে পরিবারের ৯ সদস্যের মরদেহ দেখে স্তব্ধ হয়ে গেছে উপস্থিত মানুষজন।
মোংলা উপজেলার শেহালাবুনিয়ায় বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাকের বাড়িতে শুক্রবার (১৩ মার্চ) গভীর রাত থেকেই ভিড় করেন শত শত মানুষ। কেউ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে, কেউ চোখ মুছছেন, আবার কেউ কান্না থামাতে পারছেন না। বউ বরণের আনন্দের অপেক্ষা মুহূর্তেই রূপ নেয় একসঙ্গে ৯ স্বজনের শেষ বিদায়ে।
সবকিছু ঠিক থাকলে শুক্রবার সকালে গ্রাম বাংলার চিরাচরিত রীতিতে নতুন বর-বউকে ঘিরে খুনসুটি, খাওয়া-দাওয়া আর শিশুদের হৈ-হুল্লোড়ে মুখরিত থাকত বাড়িটি। কিন্তু একটি মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই নিভিয়ে দিয়েছে সেই আনন্দের আলো, ভেঙে দিয়েছে দুই পরিবারের অসংখ্য স্বপ্ন।
গত বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বিকেলে মোংলা-খুলনা মহাসড়কের রামপাল উপজেলার বেলাই ব্রিজ এলাকায় নৌবাহিনীর একটি স্টাফ বাসের সঙ্গে নববধূকে বহনকারী মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে মাইক্রোবাসের চালকসহ দুই পরিবারের ১৪ জন নিহত হন। আহত একজনকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
নিহতদের মধ্যে বর আহাদুর রহমান সাব্বির, তাঁর বাবা আব্দুর রাজ্জাক, ভাই আবদুল্লাহ সানি, বোন উম্মে সুমাইয়া (ঐশী), তাঁর শিশু ছেলে সামিউল ইসলাম ফাহিম, বড় ভাই আশরাফুল আলম (জনি)-এর স্ত্রী ফারহানা সিদ্দিকা (পুতুল) এবং তাঁদের সন্তান আলিফ, আরফা ও ইরাম রয়েছেন।
এ ছাড়া নিহত হয়েছেন কনে মার্জিয়া আক্তার (মিতু), তাঁর ছোট বোন লামিয়া আক্তার, দাদি রাশিদা বেগম ও নানি আনোয়ারা বেগম। নিহত মাইক্রোবাস চালক নাঈমের বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার পেড়িখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা।
পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদী ইউনিয়নের নাকসা গ্রামের বাসিন্দা আবদুস সালাম মোড়লের মেয়ে মার্জিয়া আক্তারের সঙ্গে বুধবার রাতে মোংলা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকের ছোট ছেলে আহাদুর রহমানের বিয়ে হয়।
কনের বাড়িতে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে বৃহস্পতিবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে বর পক্ষ নববধূকে নিয়ে মোংলার উদ্দেশে রওনা দেয়। কিন্তু বাড়ি থেকে আর কয়েক কিলোমিটার দূরে রামপাল উপজেলার বেলাই ব্রিজ এলাকায় বিপরীত দিক থেকে আসা নৌবাহিনীর একটি বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায় একটি নবদম্পতির স্বপ্নময় পথচলা।
পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর মধ্যে মোংলায় আনা হয় ৯টি মরদেহ, কয়রায় নেওয়া হয় ৪টি এবং রামপালে নেওয়া হয় মাইক্রোবাস চালকের মরদেহ।
শুক্রবার গভীর রাতে বরের পরিবারের ৯ সদস্যের মরদেহ মোংলার শেহালাবুনিয়ায় পৌঁছালে শুরু হয় হৃদয়বিদারক দৃশ্য। এক সঙ্গে এতগুলো মরদেহ দেখে অনেকেই কান্না ধরে রাখতে পারেননি।
প্রতিবেশী শরীফ হাবিবুর রহমান বলেন, এক সঙ্গে এতগুলো লাশ আমি জীবনে দেখিনি। এটা সহ্য করার মতো নয়।
নিহত আব্দুর রাজ্জাকের ছোট ভাই সাজ্জাদ সরদার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমাদের বেড়ে ওঠা মোংলাতেই। তবে গ্রামের বাড়ি কয়রায়। রাজ্জাক ভাই তাঁর মেয়েরও বিয়ে দিয়েছেন কয়রায়। এই ছেলেরও সেখানে বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু এক দুর্ঘটনায় পুরো পরিবারটাই শেষ হয়ে গেল।
তিনি জানান, আশপাশের নয়টি মসজিদ থেকে খাটিয়া আনা হয়। গোসল শেষে একে একে নয়জন স্বজনকে খাটিয়ায় শুইয়ে রাখা হয়।
শুক্রবার জুমার নামাজের পর মোংলা উপজেলা পরিষদ চত্বরে তাঁদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে মোংলা পৌর কবরস্থানে তাঁদের দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে।
বিয়ের সানাই বাজা বাড়িতে এখন শুধুই কান্নার রোল। মুহূর্তেই বিষাদের সাগরে ডুবে গেছে দুটি পরিবার। যে উঠানে আজ নতুন বউয়ের পা পড়ার কথা ছিল, সেই উঠানেই হলো স্বজনদের শেষ বিদায়। শোক আর অশ্রুতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।