ইঞ্জিন সঙ্কটে বিপর্যয়ের মুখে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন। যেখানে প্রতিদিন ১১৯টি ইঞ্জিন প্রয়োজন, সেখানে মাত্র ৭৫ থেকে ৭৬টি মিলছে। ফলে যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল যেমন একদিকে স্বাভাবিক রাখা যাচ্ছে না, অন্যদিকে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও বিশ্রামের সুযোগ না পেয়ে রেল ইঞ্জিনগুলো দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাতে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। ইঞ্জিন সংকটে ট্রেনের সময়সূচিতে সরাসরি প্রভাব পড়ছে। প্রতিদিনই একাধিক ট্রেন এক থেকে দেড় ঘণ্টা দেরিতে ছাড়ছে। তাতে ক্ষুব্ধ হয়ে বিভিন্ন স্টেশনে বিক্ষোভ করছেন যাত্রীরা। তাছাড়া গত কয়েক বছরে ইঞ্জিন সংকটে চট্টগ্রাম-দোহাজারী, চট্টগ্রাম-নাজিরহাট, চট্টগ্রাম-কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম-সিলেট রুটসহ একাধিক লাইনে বন্ধ হয়ে গেছে লোকাল ও মেইল ট্রেন চলাচল। এবার চট্টগ্রাম-জামালপুরগামী নাসিরাবাদ এক্সপ্রেসটিও বন্ধের মুখে। বর্তমানে প্রতি মাসে সাত-আট দিন করে ট্রেনটির যাত্রা বাতিল হচ্ছে। দিন দিন যাত্রা বাতিল বাড়ছে। মূলত ইঞ্জিনের অভাবেই ট্রেনটির সবচেয়ে বেশি যাত্রা বাতিল হচ্ছে। নতুন ইঞ্জিন না পাওয়া পর্যন্ত এ অবস্থার পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, পূর্বাঞ্চল রেলের যাত্রী পরিবহন ব্যবস্থা বিদ্যমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে অচিরেই ভেঙে পড়বে। আর পণ্য পরিবহনে যেখানে প্রতিদিন ১৫টি ইঞ্জন প্রয়োজন, সেখানে মাত্র পাঁচটি মিলছে। সঙ্কটের কারণে বর্তমানে একটি ইঞ্জিন ট্রিপ শেষ করার পর স্বাভাবিকভাবে ৪৫ মিনিট ফুয়েল ও মেইনটেনেন্স চেক, তারপর আরো ৪৫ মিনিট এলএম চেকিং এবং ৭২ ঘণ্টার পর ছয় ঘণ্টা পূর্ণ শাটডাউন রেখে পরীক্ষা করার নিয়ম থাকলেও তা মানা যাচ্ছে না। ফলে যেসব ইঞ্জিন আছে সেগুলোর আয়ুষ্কাল দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
সূত্র জানায়, গত কয়েক বছরে ইঞ্জিন সংকটের কারণে চট্টগ্রাম-দোহাজারী রুটে চলাচল করা দুই জোড়া লোকাল ট্রেন, চট্টগ্রাম-নাজিরহাট রুটে চলাচল করা দুই জোড়া লোকাল ট্রেন, চট্টগ্রাম-কুমিল্লা পর্যন্ত চলাচল করা ট্রেন ও চট্টগ্রাম-সিলেট রুটে চলাচল করা জালালাবাদ এক্সপ্রেসসহ একাধিক লাইনে লোকাল ও মেইল ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। যাত্রীবাহীর পাশাপাশি কনটেইনার ও তেলবাহী ট্রেন চলাচলেও বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। পণ্য পরিবহনে প্রতিদিন যেখানে ১৩টি ইঞ্জিন প্রয়োজন, সেখানে মিলছে পাঁচটি। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকার কমলাপুর আইসিডিতে কনটেইনার পরিবহনের জন্য দরকার পাঁচটি, অথচ মিলছে একটি কিংবা দুটি ইঞ্জিন। একই সমস্যা তেল পরিবহনেও দেখা দিয়েছে। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরে ঢাকার আইসিটিগামী কনটেইনারের জট আগের চেয়ে বেড়েছে। বর্তমানে এক হাজার ৩০০ কনটেইনারের স্তূপ জমে আছে। মূলত চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কনটেইনার আনা-নেওয়ার জন্য চাহিদামতো ট্রেনের ইঞ্জিন না পাওয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
সূত্র আরো জানায়, প্রতিদিন পূর্বাঞ্চলে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ১১৯টির মতো ইঞ্জিন দরকার। কিন্তু এখন প্রতিদিন গড়ে ৭৫ থেকে ৭৬টি ইঞ্জিন মিলছে। মূলত মালবাহী ট্রেন থেকে ইঞ্জিন এনে কোনোরকমে সামাল দেয়া হচ্ছে। কিন্তু ইঞ্জিন বেশি ব্যবহারের কারণে দ্রুত স্থায়িত্ব হারাচ্ছে। দ্রুত ইঞ্জিন সংকট সমাধান না হলে রেলে যাত্রী পরিবহনে বড় প্রভাব পড়বে। বর্তমানে রেলের যাত্রীবাহী ট্রেনে যতোগুলো ইঞ্জিন চলছে, তার ৫০ শতাংশের বেশির আয়ুষ্কাল ফুরিয়ে গেছে। অর্থাৎ ২০ বছরের আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে। যে কারণে ইঞ্জিনে যান্ত্রিক ত্রুটিও বেশি দেখা দিচ্ছে।
এদিকে এ প্রসঙ্গে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. সুবক্তগীন জানান, চাহিদা অনুযায়ী পূর্বাঞ্চল রেলে ইঞ্জিন নেই। যেগুলো আছে সেগুলোকে যতটুকু সময় বিশ্রাম দেয়া প্রয়োজন তা দেয়া যাচ্ছে না। কেননা একটি ট্রেন ট্রিপ শেষ করে আসার পর ওই ইঞ্জিন আরেকটি ট্রেনে লাগানো হচ্ছে। এভাবেই চলছে। ইঞ্জিন সংকটের কারণে নতুন করে ট্রেন বাড়ানো যাচ্ছে না। মন্ত্রণালয়ে ইঞ্জিনের চাহিদা দেয়া হয়েছে। ইঞ্জিন কেনার বিষয়টি সরকারের উচ্চ মহলের ওপর নির্ভর করছে। ইঞ্জিন না বাড়লে সমাধান নেই।