বিদেশ : ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত কয়েক দিনের ব্যবধানে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় চার ডলার বেড়ে গত দুই মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৬৪ ডলার ১৫ সেন্টে উন্নীত হয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন তেলের মানদণ্ড ওয়েস্ট টেঙ্াস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৫৯ ডলার ৭৮ সেন্টে দাঁড়িয়েছে, যা গত ৮ ডিসেম্বরের পর সর্বোচ্চ। ওপেকের অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশ ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ এবং এর প্রেক্ষিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক হস্তক্ষেপের হুঁশিয়ারি তেলের বাজারে এই অস্থিরতা তৈরি করেছে। ইরানে ১৬ দিন ধরে চলা বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে অন্তত ৬৪৮ জন নিহত হওয়ার খবর জানিয়েছে নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুধু সামরিক পদক্ষেপের হুমকিই দেননি, বরং তিনি ঘোষণা করেছেন যে যেসব দেশ ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করবে, তাদের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করবে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের বিষয়ে পরবর্তী কঠোর পদক্ষেপ নির্ধারণে ট্রাম্প আজ তার জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টাদের সঙ্গে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসতে পারেন। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের মতো বড় উৎপাদনকারীর সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ‘ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি প্রিমিয়াম’ বাড়িয়ে দিয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক ব্যাংক বার্কলেস জানিয়েছে, তেলের বর্তমান দামের মধ্যে ব্যারেলপ্রতি ৩ থেকে ৪ ডলার মূলত এই রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণেই বেড়েছে। তেলের বাজারের এই অস্থিরতার পেছনে ভেনেজুয়েলা এবং ইউক্রেন পরিস্থিতিও ভূমিকা রাখছে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত ও অপহৃত হওয়ার পর ট্রাম্প জানিয়েছেন যে কারাকাসের নতুন সরকার যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৫ কোটি ব্যারেল তেল হস্তান্তর করতে পারে। ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদের ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় বড় জ্বালানি কোম্পানিগুলো এগিয়ে থাকায় বাজারে এক ধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করছে। অন্যদিকে আজ ভোরে ইউক্রেনের খারকিভসহ বড় শহরগুলোতে রাশিয়ার নতুন করে হামলা বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে চাপের সৃষ্টি করেছে। ভূ-রাজনৈতিক এই সংঘাতগুলো জ্বালানি সরবরাহের নিরবচ্ছিন্নতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে শঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে। এছাড়া মার্কিন অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও তেলের চাহিদাকে প্রভাবিত করছে। ট্রাম্প প্রশাসন দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দেওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি নিয়ে এই অনিশ্চয়তা তেলের দীর্ঘমেয়াদী চাহিদাকে সংকুচিত করতে পারে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থা এবং ওয়াশিংটনের কঠোর বাণিজ্যিক নীতি বিশ্বজ্বালানি বাজারকে এক অনিশ্চিত ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। সূত্র: রয়টার্স