বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:০৯ অপরাহ্ন
Notice :
Wellcome to our website...

বিদেশি ঋণের বোঝায় অর্থনীতিতে বাড়ছে চাপ

প্রতিনিধি: / ৩ দেখেছেন:
পাবলিশ: বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল, ২০২৬

রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশে বৈদেশিক ঋণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণ দাঁড়ায় ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। গত বছরের শুধু অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর- এ তিন মাসেই ঋণ বেড়েছে ১ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার, সেপ্টেম্বর শেষে ঋণের পরিমাণ ছিল ১১২ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলার। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় দেশের মোট ঋণ ছিল ১০৩ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ প্রায় দেড় বছরে ঋণ বেড়েছে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার। সরকারি খাতেই সবচেয়ে বেশি ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে সরকারি খাতে সেপ্টেম্বরের ৯২ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ঋণ বেড়ে ডিসেম্বর শেষে দাঁড়িয়েছে ৯৩ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলারে, অন্যদিকে বেসরকারি খাতে একই সময়ে ১৯ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ঋণ বেড়ে ২০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ফলে মোট ঋণ বৃদ্ধির বড় অংশই এসেছে সরকারি খাত থেকে যা মূলত উন্নয়ন ব্যয় ও বাজেট ঘাটতি সামাল দিতেই বেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে। গত এক দশকে বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ নিয়েছে, এর মধ্যে রয়েছে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে, টানেল, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বিমানবন্দরের সমপ্রসারণ প্রকল্প। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও ঋণ নেওয়ার ধারা অব্যাহত ছিল, বিশেষ করে বাজেট ঘাটতি পূরণ, সরকারি বেতন-ভাতা পরিশোধ ও অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা- এসব কারণে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার নতুন ঋণ নেওয়া হয়েছিল। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বৈশ্বিক বাজার অস্থির হয়ে ওঠে যার প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনে, এতে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং ডলারের চাহিদা দ্রুত বাড়তে থাকে, টাকার বিপরীতে ডলার ৮৫ থেকে প্রায় ১২২ টাকায় ওঠে। ফলে রিজার্ভে চাপ তৈরি হয় এবং অর্থনীতি সচল রাখতে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ে, তবে সামপ্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক সহায়তা বাড়ায় পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হয়। অর্থনীতিবিদরা বলছেন বৈদেশিক ঋণ নিজে সমস্যা নয়- যদি তা উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করা হয়। বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, বাংলাদেশের জিডিপির তুলনায় বিদেশি ঋণ এখনো সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে, তবে ঋণের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে তা বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বাংলাদেশে ঋণের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল, তবে তা মূলত অনুদান ও স্বল্পসুদে ঋণ আকারে আসত। আশির দশকে কাঠামোগত সংস্কার কর্মসূচি এবং নব্বইয়ের দশকে বেসরকারি খাতের সমপ্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে বৈদেশিক ঋণের ধারা বাড়তে থাকে। একবিংশ শতকে এসে বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণে ঋণের পরিমাণ বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, ঢাকা মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, বিমানবন্দর সমপ্রসারণ- এসব প্রকল্পে বৈদেশিক অর্থায়ন ছিল অপরিহার্য। ফলে ঋণের বোঝা ক্রমশ বাড়তে থাকে। খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায় সরকারি খাতের ঋণ সবচেয়ে বেশি, যা মূলত উন্নয়ন প্রকল্প ও বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যবহৃত হয়। বেসরকারি খাতেও ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষ করে শিল্প ও আমদানি খাতে। তবে সরকারি খাতের ঋণ বৃদ্ধিই সামগ্রিক চাপ বাড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক তুলনায় বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ জিডিপির অনুপাতে এখনো সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও প্রবৃদ্ধি ও রফতানি আয় প্রত্যাশামতো না বাড়লে ভবিষ্যতে তা বড় সংকটে পরিণত হতে পারে বলে শঙ্কা রায়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন ঋণ ব্যবস্থাপনা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু ঋণ নেওয়া নয়, বরং তা উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার নিশ্চিত করাই জরুরি। যদি ঋণ দিয়ে এমন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয় যা দীর্ঘমেয়াদে আয় সৃষ্টি করবে, তবে ঋণ বোঝা নয় বরং উন্নয়নের চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু যদি ঋণ অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় হয়, তবে তা ভবিষ্যতে বড় সংকট তৈরি করবে। কারণ ভবিষ্যতে শোধের চাপ বাড়বে, কারণ বড় অঙ্কের ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হবে। বিশেষ করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও মেট্রোরেলের মতো প্রকল্পের ঋণ শোধের সময় ঘনিয়ে আসছে। তখন বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে। যদি রফতানি ও রেমিট্যান্স প্রত্যাশামতো না বাড়ে, তবে সংকট আরও তীব্র হবে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন ঋণের পরিমাণের চেয়ে বড় উদ্বেগ হলো সুদ ও কিস্তি পরিশোধের চাপ, ভবিষ্যতে বড় অঙ্কের ঋণ শোধ শুরু হলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়তে পারে বিশেষ করে যদি রফতানি ও রেমিট্যান্স প্রত্যাশামতো না বাড়ে। অর্থনীতিবিদদের মতে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বৈদেশিক অর্থায়ন প্রয়োজন হলেও ঋণের ব্যবস্থাপনা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। তারা তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন- ঋণের কার্যকর ও উৎপাদনশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা, রফতানি ও রেমিট্যান্স বাড়ানো এবং নতুন ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা ও ঝুঁকি মূল্যায়ন। বিশ্লেষকরা বলছেন বর্তমানে বৈদেশিক ঋণ তাৎক্ষণিকভাবে সংকটজনক না হলেও এর সঠিক ব্যবস্থাপনাই নির্ধারণ করবে এটি ভবিষ্যতে অর্থনীতির জন্য বোঝা হবে নাকি উন্নয়নের চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।


এই বিভাগের আরো খবর