ইমদাদুল হক,পাইকগাছা ( খুলনা ): খুলনার পাইকগাছায় কৃষি জমিতে জৈব সারের ব্যবহার কয়েকগুণ বেড়েছে। তরমুজ ও সবজি সহ বিভিন্ন কৃষি কাজে বেশিরভাগ কৃষকরা মাটির উর্বরতা শক্তি বাড়াতে ব্যবহার করছে জৈব সার। কেনা জৈব সারের তুলনায় এলাকার উৎপাদিত ভার্মি কম্পোস্ট এর গুণগত মান হওয়ায় এলাকায় এর প্রচুর চাহিদা রয়েছে। এ কারণে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন উদ্দোক্তা। জিএম শুকুরুজ্জামান নতুন উদ্দোক্তাদের মধ্যে একজন সফল উদ্দোক্তা। বছরে তিনি উৎপাদন করছেন ২০ মেট্রিক টন ভার্মি কম্পোস্ট। ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন করে তিনি বাড়তি আয় করছেন। তাকে অনুসরণ করে অনেকেই আগ্রহী হয়েছেন ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনের জন্য। চাহিদার সাথে জৈব সারের উৎপাদন বাড়লে কৃষি জমিতে রাসায়নিক সারের ব্যবহার তুলনামূলক অনেক কমে আসবে বলে মনে করছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
কৃষি প্রধান অত্র এলাকায় এক সময় কৃষকরা কৃষি ফসল উৎপাদনের জন্য জৈব সার ছাড়া কিছুই বুঝতো না। যেকোনো ফসল উৎপাদনে ব্যবহার করতো জৈব সার। বিগত দুই থেকে তিন দশকে কৃষি কাজে জৈব সারের ব্যবহার একেবারেই কমে যায়। যে জৈব সার মাটির প্রাণ, তা ব্যবহার করতে কৃষকরা যেন ভুলে যায়। ব্যবহার বাড়ে রাসায়নিক সারের। বছরের পর বছর অতিমাত্রায় রাসায়নিক সার ব্যবহার করার ফলে মাটিতে জৈব উপাদান নেমে আসে শুন্যের কোটায়। মাটির উর্বরতা শক্তি বাড়াতে এবং জৈব উপাদান ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নেয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় পরামর্শ ও কারিগরি সহযোগিতার মাধ্যমে ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করেন এবং এর সাথে কৃষি কাজে জৈব সার ব্যবহারে কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে নানা পদক্ষেপ নেয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। কৃষি বিভাগের ব্যবস্থাপনায় একদিকে যেমন কৃষি কাজে ব্যবহার বেড়েছে জৈব সার, অন্যদিকে চাহিদা থাকায় জৈব সার উৎপাদনে এগিয়ে আসছে নতুন নতুন উদ্দোক্তা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আওতায় স্থানীয় উপজেলা কৃষি অফিসের সহযোগিতায় ২০২৪ সালে ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন শুরু করে উপজেলার গদাইপুর ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামের মৃত গাজী আবুল কাশেমের ছেলে জিএম শুকুরুজ্জামান। শুকুরুজ্জামান জাতীয় স্বর্ণপদক প্রাপ্ত ষোলআনা ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি নিজের বসতবাড়িতেই ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন করে এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলে দিয়েছেন। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা তার উৎপাদিত ভার্মি কম্পোস্ট কিনে নিয়ে ব্যবহার করছেন কৃষি কাজে। ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন করার মূল উপকরণ হচ্ছে গোবর ও থাই প্রজাতির কেঁচো। নিজের গবাদি পশুর গোবর এবং কেঁচো দিয়ে বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শুকুরুজ্জামান উৎপাদন করছেন ভালো মানের জৈব সার। দুই বছরের মধ্যে শুকুরুজ্জামানের সারের গুণগত মানের কথা ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন এলাকায়। সারা বছর কমবেশি বিক্রয় হলেও নভেম্বর থেকে মার্চ এপ্রিল মাস পর্যন্ত চাহিদা বেশি থাকে। একারণে আগে থেকেই উৎপাদিত সার মজুদ করে রাখেন এবং সিজনে তা সরবরাহ করেন কৃষকদের মাঝে। কৃষকরা ও সুলভ মূল্যে সময়মতো সার পেয়ে খুশি। বাইনবাড়িয়ায় কৃষক তন্ময় বাইন বলেন আমি এ বছর ১৫ বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করছি। আমার প্রয়োজনীয় জৈব সার শুকুরুজ্জামানের কাছ থেকে কিনেছি। হুগলার চক গ্রামের মডেল কৃষক মলয় মন্ডল বলেন বাজারে কেনা সারের চেয়ে শুকুরুজ্জামানের সারের মান অনেক ভালো, এজন্য আমার প্রয়োজনীয় সব সার তার কাছ থেকে নেয়। উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বলেন প্রথমে তিনি ১২ থেকে ১৫ টি হাউজে শুরু করেন। বর্তমানে তার উৎপাদন এখন অনেক বেশি। সারের মান ভালো হওয়ায় এলাকার কৃষকরা তার সার ব্যবহার করছে। জিএম শুকুরুজ্জামান বলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন শুরু করি। এলাকায় প্রচুর চাহিদা থাকায় পর্যায়ক্রমে উৎপাদন বাড়াতে থাকি। বর্তমানে আশেপাশের কৃষকরা ছাড়াও দূরদূরান্তের কৃষকরাও আমার এখানে সার নিতে আসেন। এলাকার অনেক নারী পুরুষ আমার খামারে কাজ করে জীবীকা নির্বাহ করছে। এর মাধ্যমে আমার বাড়তি আয় হচ্ছে যা আমি সাংসারিক ও অন্যান্য কাজে লাগাতে পারছি। উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মোঃ একরামুল হোসেন বলেন ভার্মি কম্পোস্ট একটি উপকারী সার। এটাকে মাটির প্রাণ বলা হয়ে থাকে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই এলাকার কোথাও কারোর মাটিতে এক ভাগ ও জৈব উপাদান নাই। এ অবস্থায় কৃষি কাজে জৈব সার ব্যবহারের বিকল্প নাই। এ ক্ষেত্রে জিএম শুকুরুজ্জামান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় নতুন উদ্দোক্তা হিসেবে ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন করে ইতোমধ্যে এলাকায় ব্যাপক পরিচিতি লাভ করছেন। সাধারণ কেনা সারের চেয়ে উৎপাদিত ভার্মি কম্পোস্ট অনেক ভালো। কৃষকরা এখন কৃষি কাজে বিশেষ করে তরমুজ, সবজি, নার্সারি ও ছাদ বাগান সহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদনে জৈব সার ব্যবহার করছে। যার সিংহভাগ যোগান আসছে ভার্মি কম্পোস্ট থেকে। মাটির উর্বরতা শক্তি বাড়াতে এমন জৈব উপাদান ফিরিয়ে আনতে ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন এবং ব্যবহার বাড়াতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কাজ করছে বলে কৃষি বিভাগের এ কর্মকর্তা জানান।