কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলে থাকা এক কিশোরীর নিথর দেহ যে প্রশ্ন তুলেছিল মানবতা ও ন্যায়ের, তার উত্তর আজও অধরা। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী সীমান্তে বাংলাদেশি কিশোরী ফেলানী খাতুন হত্যার ১৫ বছর পূর্ণ হয়েছে বুধবার (৭ জানুয়ারি)। এত বছর পেরিয়ে গেলেও ভারতের উচ্চ আদালতে বিচারিক প্রক্রিয়া ঝুলে থাকায় ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় দিন গুনছে তার পরিবার।
২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের ভোরে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর হাজিটারী সীমান্তে বাবার সঙ্গে কাঁটাতারের বেড়া পার হওয়ার সময় বিএসএফের গুলিতে নিহত হয় ফেলানী। অভিযোগ অনুযায়ী, সীমান্তের ৯৪৭/৩এস আন্তর্জাতিক পিলারের পাশে চৌধুরীহাট ক্যাম্পের সদস্যরা তাকে আটক করে পাশের একটি সরিষা ক্ষেতে নিয়ে যায়। সেখানে নির্যাতনের পর গুলি করে হত্যা করা হয় এবং মরদেহ কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলিয়ে রাখা হয়।
দীর্ঘ সময় কাঁটাতারে ঝুলে থাকা ফেলানীর মরদেহের ছবি দেশি ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। বাংলাদেশে সীমান্ত হত্যা বন্ধের দাবিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও সমাবেশ করে। সে সময় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতকে কড়া প্রতিবাদ জানানো হয়।
এই হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু হয় ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট ভারতের কোচবিহারে বিএসএফের বিশেষ আদালতে। ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম দু’দফা সাক্ষ্য দিলেও একই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। রায় পুনর্বিবেচনার আবেদনের পর ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পুনর্বিচার হলেও সেবারও একই রায় আসে।
ন্যায়বিচারের আশায় ২০১৫ সালে ভারতের আইনজীবী অপর্ণাভাট ও মানবাধিকার সংগঠন মাসুমের সহায়তায় ভারতের উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন করেন নুর ইসলাম। ওই মামলার শুনানি ২০১৬, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে একাধিকবার পিছোয়। সর্বশেষ ২০২০ সালের ১৮ মার্চ শুনানির তারিখ নির্ধারিত হলেও আজও মামলাটির নিষ্পত্তি হয়নি।
ফেলানী হত্যার ১৫ বছর উপলক্ষে বুধবার বাদ যোহর কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার দক্ষিণ রামখানা কলোনীটারী জামে মসজিদে তার রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা উপস্থিত থাকবেন। একই দিনে ফেলানীর বাবা-মা ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত ফেলানী দিবসের কর্মসূচিতে অংশ নেন।
ফেলানীর মা জাহানারা বেগম বলেন, “প্রতি বছর ৭ জানুয়ারি এলেই বুক ফেটে কান্না আসে। ১৫ বছর হয়ে গেল, এখনো আমার মেয়ের হত্যার বিচার পেলাম না। হত্যাকারীর শাস্তি হলে ফেলানীর আত্মা শান্তি পাবে।” তিনি বলেন, এই বিচার হলে সীমান্তে আর কোনো মায়ের বুক খালি হতো না।
ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম বলেন, “আমি ভারতের সুপ্রিম কোর্টে ন্যায়বিচারের আশায় রিট করেছি। কিন্তু এত দিনেও বিচার হচ্ছে না।” তিনি বর্তমান সরকারের কাছে মামলাটি নতুন করে উপস্থাপন করে অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্যের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান। পাশাপাশি ফেলানীর স্মৃতি ধরে রাখতে গ্রামের ফেলানী মোড় থেকে বাড়ি পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা পাকাকরণ ও এর নাম ‘ফেলানী সড়ক’ করার দাবিও জানান তিনি।
আইনজীবীরা বলছেন, এই হত্যাকাণ্ডের বিচার হলে সীমান্তে হত্যার প্রবণতা কমতে পারে। কুড়িগ্রামের সিনিয়র আইনজীবী ও জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট ফখরুল ইসলাম বলেন, ভারতের আদালতে দোষীর শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে বিএসএফ সদস্যরা এমন অপরাধ করতে সাহস পেত না।
নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের কলোনীটারী গ্রামের নুর ইসলাম ও জাহানারা বেগম দম্পতির আট সন্তানের মধ্যে সবার বড় ছিলেন ফেলানী। পরিবারের অভাবের কারণে ভারতে কাজ শেষে বিয়ের উদ্দেশ্যে দেশে ফেরার পথেই সীমান্তে তার জীবন থেমে যায়। ১৫ বছর পরও সেই কবর আর ন্যায়বিচারের অপেক্ষাই হয়ে আছে পরিবারের একমাত্র সম্বল।