আনন্তর্জাতিক ডেস্ক: দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় ব্যাপক হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ‘আটক’ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। পরে মাদুরো সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। এই ঘটনা কলম্বিয়ায় ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী। এমনকি নিরাপত্তা, অভিবাসন সংকট ও কূটনৈতিক সম্পর্কে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, গত শনিবার ভোরে ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলা- যার মধ্যে সামরিক স্থাপনায় আঘাত এবং মাদুরোকে আটক করার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে কলম্বিয়া। একই সঙ্গে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে ২ হাজার ২১৯ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত আরও সুরক্ষিত করার ঘোষণা দিয়েছে দেশটি। এই সীমান্ত দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্রোহ এবং কোকেন উৎপাদনের জন্য কুখ্যাত। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, মাদুরোকে সরিয়ে দেয়ার ঘটনায় কলম্বিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। শরণার্থী সহায়তা সংস্থাগুলোও বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক হস্তক্ষেপের পর নতুন করে বড় ধরনের অভিবাসন ঢেউ তৈরি হলে তার মূল বোঝা বহন করতে হবে কলম্বিয়াকেই। কলম্বিয়ান প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর তথ্যমতে, রাত ৩টায় জরুরি জাতীয় নিরাপত্তা বৈঠক করেছে সরকার। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এঙ্-এ দেয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘ভেনেজুয়েলা ও লাতিন আমেরিকার সার্বভৌমত্বের ওপর হামলার নিন্দা জানায় কলম্বিয়া সরকার’। সীমান্ত রক্ষায় রাষ্ট্রীয় বাহিনী মোতায়েনের কথাও জানান তিনি।
শরণার্থীদের ঢল নামার আশঙ্কা
সহিংসতা বাড়ার আশঙ্কার পাশাপাশি ভেনেজুয়েলায় সংঘাত শুরু হলে সম্ভাব্য অভিবাসন সংকটের ধাক্কাও সহ্য করতে হতে পারে কলম্বিয়াকে। গত শনিবার সকালে এঙ্-এ দেয়া পোস্টে পেত্রো জানান, পূর্ব সীমান্তে মানবিক সহায়তা জোরদার করা হয়েছে। তিনি লেখেন, ‘শরণার্থীর বড় ধরনের ঢল নামলে আমাদের হাতে থাকা সব সহায়তা সম্পদ কাজে লাগানোর প্রস্তুতি রয়েছে।’ এ পর্যন্ত বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ভেনেজুয়েলান শরণার্থী আশ্রয় দিয়েছে কলম্বিয়া। প্রায় ৮০ লাখের মধ্যে ৩০ লাখ এই দেশটিতে থাকছে। ২০১৯ সালের আগের বড় অভিবাসন ঢলে মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার বিরোধী নেতা হুয়ান গুয়াইদোর ব্যর্থ চেষ্টার পর শরণার্থীদের থাকার জায়গা, খাবার ও চিকিৎসা দিতে বড় মানবিক উদ্যোগ নিতে হয়েছিল দেশটিকে। তবে এবার কাজটি আরও চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। কারণ গত বছর ট্রাম্প প্রশাসন ইউএসএইড কর্মসূচি বন্ধ করে দেয়ার পর কলম্বিয়া তাদের প্রায় ৭০ শতাংশ মানবিক তহবিল হারিয়েছে। ভেনেজুয়েলান প্রবাসী নেতা হুয়ান কার্লোস ভিলোরিয়া বলেন, ‘খুব দ্রুত শরণার্থীদের ঢল নামার বাস্তব আশঙ্কা রয়েছে বিশেষ করে অস্থিরতা, প্রতিশোধ বা ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হলে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কলম্বিয়াকে এখনই সুরক্ষা ব্যবস্থা, মানবিক করিডর ও আশ্রয়প্রক্রিয়া সক্রিয় করতে হবে- যাতে শরাণার্থীদের সম্ভাব্য ঢল মোকাবিলায় শুধু সাড়া দেয়া নয়, সীমান্তে বিশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনও ঠেকানো যায়।’
যুক্তরাষ্ট্র-কলম্বিয়া সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন
বিশ্লেষকদের মতে, মাদুরোকে সরিয়ে দেয়ার ঘটনা প্রেসিডেন্ট পেত্রোর জন্যও জটিলতা তৈরি করেছে। কারণ গত বছর ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকেই কলম্বিয়ার এই প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার বাকযুদ্ধ চলছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ক্যারিবীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা এবং একজন কলম্বিয়ান জেলের নিহত হওয়ার অভিযোগ তুলে পেত্রো ট্রাম্পের রোষানলে পড়েন। জবাবে হোয়াইট হাউস পেত্রোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। এছাড়া ট্রাম্প তাকে ‘ভণ্ড’ এবং ‘মাদক পাচারকারী’ বলেও আখ্যা দেন।
ইএলএন ফ্যাক্টর
ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (ইএলএন) নামের বামপন্থি গোষ্ঠী এখনও কলম্বিয়ার সবচেয়ে বড় বিদ্রোহী শক্তি। গত ডিসেম্বরেও তারা ‘সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপের’ বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রস্তুতির কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, হামলার পর কলম্বিয়ার জন্য সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি এসেছে ইএলএন থেকে। কারণ এই গোষ্ঠীটি প্রায় পুরো সীমান্ত অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণে রাখে। বিদ্রোহী এই গোষ্ঠীটি কোকেন পাচারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এবং সীমান্তের দুই পাশেই সক্রিয়। মাদুরো সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক থেকে তারা উপকৃত হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে তাদের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক হুমকির মুখে পড়তে পারে। ইএলএন নিজেদেরকে এই অঞ্চলে মার্কিন ‘সাম্রাজ্যবাদের’ বিরুদ্ধে একটি রক্ষাকবচ হিসেবে তুলে ধরে। কলম্বিয়া ও ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে হোয়াইট হাউসের হুমকির জবাবে তারা ইতোমধ্যে সহিংসতা বাড়িয়েছে। ডিসেম্বর মাসে তারা সাধারণ মানুষকে ঘরে থাকার নির্দেশ দেয় এবং দেশজুড়ে সরকারি স্থাপনায় বোমা হামলা চালায়। আর এটিকে তারা ‘মার্কিন আগ্রাসনের জবাব’ হিসেবে বর্ণনা করে। মাদুরোকে সরিয়ে দেয়ার পর সম্ভাব্য প্রতিশোধ ঠেকাতে কলম্বিয়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করেছে। গত শনিবার সকালে কলম্বিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘জনগণ, কৌশলগত স্থাপনা, দূতাবাস, সামরিক ও পুলিশ ইউনিট- সবকিছু রক্ষায় নিরাপত্তা বাহিনীর সব সক্ষমতা সক্রিয় করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইএলএন কার্টেলের মতো আন্তঃদেশীয় অপরাধচক্রের যে কোনও সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হামলাও প্রতিরোধ করা হচ্ছে।’