Dhaka ১২:২১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গাজায় থার্মোবারিক অস্ত্র বা ভ্যাকুয়াম বোমা ব্যবহারের লোমহর্ষক তথ্য

  • Reporter Name
  • Update Time : ১২:৩১:২৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৬৩ Time View

বিদেশ: ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানে গাজা উপত্যকায় আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ ও মানবতাবিরোধী থার্মোবারিক অস্ত্র বা ভ্যাকুয়াম বোমা ব্যবহারের লোমহর্ষক তথ্য বেরিয়ে এসেছে। গত সোমবার আল জাজিরায় সমপ্রচারিত দ্য রেস্ট অব দ্য স্টোরি শীর্ষক এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই মরণঘাতী অস্ত্রের আঘাতে অন্তত ২ হাজার ৮৪২ জন ফিলিস্তিনি নাগরিক মুহূর্তের মধ্যে বাষ্পীভূত হয়ে চিরতরে বিলীন হয়ে গেছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে গাজার সিভিল ডিফেন্স টিম এই বিপুল সংখ্যক মানুষের নিখোঁজ হওয়ার নেপথ্যে নিষিদ্ধ এই তাপীয় অস্ত্রের প্রভাব খুঁজে পেয়েছে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি বলছে, গাজার সিভিল ডিফেন্স কর্মীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে এমন সব দৃশ্য দেখেছেন যা আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে বিরল। নিহতদের অনেকেরই হাড় বা মাংসের ক্ষুদ্র অংশ ছাড়া আর কোনো অবশিষ্টাংশ খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, থার্মোবারিক অস্ত্র বিস্ফোরণের সময় কয়েক হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা তৈরি করে, যা মানুষের টিস্যু ও হাড়কে মুহূর্তের মধ্যে ভস্মে পরিণত করতে সক্ষম। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিচালক মুনির আল-বুরশ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে জানান, যেহেতু মানবদেহের বড় অংশই পানি, সেহেতু প্রচণ্ড তাপ ও চাপের ফলে দেহের তরল অংশ দ্রুত ফুটে উঠে টিস্যুগুলো বাষ্পীভূত হয়ে যায়। ফিলিস্তিনি সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল উদ্ধার অভিযানের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, তারা প্রতিটি হামলার পর বিয়োজন পদ্ধতি অনুসরণ করেন। অর্থাৎ, একটি বাড়িতে কতজন সদস্য ছিলেন তা নিশ্চিত হওয়ার পর উদ্ধারকৃত লাশের সংখ্যার সঙ্গে তা মেলানো হয়। যখন দীর্ঘ সময় খোঁজাখুঁজির পরও কোনো দেহাবশেষ পাওয়া যায় না, তখন তাদের নিখোঁজ হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভবনের কাঠামো আংশিক অক্ষত থাকলেও ভেতরের মানুষগুলো আগুনের প্রচণ্ড উত্তাপে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছেন। তদন্তে আরও উঠে এসেছে, গাজায় সংঘটিত এই ধ্বংসযজ্ঞের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি এমকে-৮৪ এবং জিবিইউ-৩৯ এর মতো শক্তিশালী বোমাগুলো জড়িত থাকতে পারে। হামলার স্থানগুলোতে এসব উন্নত অস্ত্রের ধ্বংসাবশেষও খুঁজে পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বেসামরিক জনপদে এই ধরণের নির্বিচার মারণাস্ত্র ব্যবহার করা যুদ্ধাপরাধের শামিল। তারা মনে করেন, এই পাশবিকতার দায় শুধু ইসরায়েলের নয়, বরং যারা এসব অস্ত্রের জোগান দিচ্ছে সেই সরবরাহকারী দেশগুলোর ওপরও বর্তায়। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বারবার সতর্কবার্তা সত্ত্বেও গাজায় সহিংসতার মাত্রা কমেনি। মানবাধিকার কর্মীদের অভিযোগ, গাজার ক্ষেত্রে বৈশ্বিক বিচারব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক আইন কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে একের পর এক নিষিদ্ধ মারণাস্ত্রের পরীক্ষা চালানো হয়েছে নিরীহ মানুষের ওপর, যা মানবসভ্যতার জন্য এক চরম কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে।

Tag :
About Author Information

গাজায় থার্মোবারিক অস্ত্র বা ভ্যাকুয়াম বোমা ব্যবহারের লোমহর্ষক তথ্য

Update Time : ১২:৩১:২৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বিদেশ: ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানে গাজা উপত্যকায় আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ ও মানবতাবিরোধী থার্মোবারিক অস্ত্র বা ভ্যাকুয়াম বোমা ব্যবহারের লোমহর্ষক তথ্য বেরিয়ে এসেছে। গত সোমবার আল জাজিরায় সমপ্রচারিত দ্য রেস্ট অব দ্য স্টোরি শীর্ষক এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই মরণঘাতী অস্ত্রের আঘাতে অন্তত ২ হাজার ৮৪২ জন ফিলিস্তিনি নাগরিক মুহূর্তের মধ্যে বাষ্পীভূত হয়ে চিরতরে বিলীন হয়ে গেছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে গাজার সিভিল ডিফেন্স টিম এই বিপুল সংখ্যক মানুষের নিখোঁজ হওয়ার নেপথ্যে নিষিদ্ধ এই তাপীয় অস্ত্রের প্রভাব খুঁজে পেয়েছে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি বলছে, গাজার সিভিল ডিফেন্স কর্মীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে এমন সব দৃশ্য দেখেছেন যা আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে বিরল। নিহতদের অনেকেরই হাড় বা মাংসের ক্ষুদ্র অংশ ছাড়া আর কোনো অবশিষ্টাংশ খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, থার্মোবারিক অস্ত্র বিস্ফোরণের সময় কয়েক হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা তৈরি করে, যা মানুষের টিস্যু ও হাড়কে মুহূর্তের মধ্যে ভস্মে পরিণত করতে সক্ষম। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিচালক মুনির আল-বুরশ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে জানান, যেহেতু মানবদেহের বড় অংশই পানি, সেহেতু প্রচণ্ড তাপ ও চাপের ফলে দেহের তরল অংশ দ্রুত ফুটে উঠে টিস্যুগুলো বাষ্পীভূত হয়ে যায়। ফিলিস্তিনি সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল উদ্ধার অভিযানের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, তারা প্রতিটি হামলার পর বিয়োজন পদ্ধতি অনুসরণ করেন। অর্থাৎ, একটি বাড়িতে কতজন সদস্য ছিলেন তা নিশ্চিত হওয়ার পর উদ্ধারকৃত লাশের সংখ্যার সঙ্গে তা মেলানো হয়। যখন দীর্ঘ সময় খোঁজাখুঁজির পরও কোনো দেহাবশেষ পাওয়া যায় না, তখন তাদের নিখোঁজ হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভবনের কাঠামো আংশিক অক্ষত থাকলেও ভেতরের মানুষগুলো আগুনের প্রচণ্ড উত্তাপে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছেন। তদন্তে আরও উঠে এসেছে, গাজায় সংঘটিত এই ধ্বংসযজ্ঞের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি এমকে-৮৪ এবং জিবিইউ-৩৯ এর মতো শক্তিশালী বোমাগুলো জড়িত থাকতে পারে। হামলার স্থানগুলোতে এসব উন্নত অস্ত্রের ধ্বংসাবশেষও খুঁজে পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বেসামরিক জনপদে এই ধরণের নির্বিচার মারণাস্ত্র ব্যবহার করা যুদ্ধাপরাধের শামিল। তারা মনে করেন, এই পাশবিকতার দায় শুধু ইসরায়েলের নয়, বরং যারা এসব অস্ত্রের জোগান দিচ্ছে সেই সরবরাহকারী দেশগুলোর ওপরও বর্তায়। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বারবার সতর্কবার্তা সত্ত্বেও গাজায় সহিংসতার মাত্রা কমেনি। মানবাধিকার কর্মীদের অভিযোগ, গাজার ক্ষেত্রে বৈশ্বিক বিচারব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক আইন কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে একের পর এক নিষিদ্ধ মারণাস্ত্রের পরীক্ষা চালানো হয়েছে নিরীহ মানুষের ওপর, যা মানবসভ্যতার জন্য এক চরম কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে।