সর্বশেষ :
শনিবার, ০৩ জানুয়ারী ২০২৬, ০৭:১৫ অপরাহ্ন
Notice :
Wellcome to our website...

অর্থনীতি গভীর সংকটে, পরিসংখ্যানের উন্নতির আড়ালে বাড়ছে মানুষের দুর্ভোগ

প্রতিনিধি: / ৩ দেখেছেন:
পাবলিশ: শনিবার, ৩ জানুয়ারী, ২০২৬

উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, স্থবির মজুরি, কর্মসংস্থান সংকট ও ব্যাংকিং খাতের গুরুতর দুরবস্থার কারণে দেশের অর্থনীতি এখন গভীর সংকটে রয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যানে কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিত দেখা গেলেও বাস্তবে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জীবনে স্বস্তি ফেরেনি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আয়ের তুলনায় এতটাই বেড়েছে যে সংসার চালানো অনেক পরিবারের জন্য প্রতিদিনের সংগ্রামে পরিণত হয়েছে।

চাল, ভোজ্যতেল, শাকসবজি, পরিবহন, বাড়িভাড়া, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় পারিবারিক আয়ের বড় অংশ গ্রাস করছে। বিশেষ করে মজুরিভিত্তিক শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন। মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আয় না বাড়ায় তাদের অনিশ্চয়তা আরও গভীর হয়েছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে গড় মুদ্রাস্ফীতি কমে ৮.২৯ শতাংশে দাঁড়ায়, যা ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে ছিল ১১.৩৮ শতাংশ। তবে একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার নেমে আসে ৮.০৪ শতাংশে। এর ফলে পরিসংখ্যানগতভাবে মুদ্রাস্ফীতি কমলেও সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বাড়েনি, বরং অনেক ক্ষেত্রে আরও কমেছে।

পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানোর উদ্যোগের ফলে বৈদেশিক লেনদেনে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ২৭.৮৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৯.৯৫ বিলিয়ন ডলার। একই সঙ্গে রপ্তানি, আমদানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহেও বৃদ্ধি দেখা গেছে। তবে দুর্বল প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগের স্থবিরতা ও উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির কারণে অর্থনীতির সামগ্রিক পুনরুদ্ধার এখনও হয়নি।

কর্মসংস্থান পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে। আনুষ্ঠানিক খাতে নতুন চাকরি সৃষ্টির গতি ধীর, বিপরীতে অনানুষ্ঠানিক ও স্বল্পমেয়াদি কাজ বাড়ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান স্থায়ী নিয়োগ এড়িয়ে চলায় আংশিক বেকারত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বর্তমানে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে ২০ শতাংশেরও বেশি শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছে। শ্রমবাজারে নতুন প্রবেশকারীদের জন্য স্থিতিশীল ও মানসম্মত কাজ পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে, যা সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে।

বিনিয়োগ পরিস্থিতিও আশাব্যঞ্জক নয়। ২০২৫ সালের অক্টোবরে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে রেকর্ড সর্বনিম্ন ৬.২৩ শতাংশে। উচ্চ ব্যবসায়িক ব্যয়, ডলারের ঘাটতি ও নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ জিডিপির ১ শতাংশের নিচেই রয়ে গেছে, যা অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য ও মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথে বড় বাধা।

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ জানিয়েছেন, বর্তমানে কেউই ব্যবসা সম্প্রসারণ বা নতুন প্রকল্পের পরিকল্পনা করছেন বলে তিনি জানেন না। তাঁর ভাষায়, “সরকার ব্যবসা সম্প্রসারণ বা কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনাতেও যাচ্ছে না। ব্যাংক ঋণ পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। উচ্চ সুদের হার, ভ্যাট ও করের কারণে নতুন ব্যবসা শুরু করা বড় চ্যালেঞ্জ।” তিনি বলেন, ব্যবসায়িক কার্যক্রম কমে যাওয়ায় মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিও স্বাভাবিকভাবেই হ্রাস পাচ্ছে।

অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি এখন ব্যাংকিং খাত। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬.৪৪ লক্ষ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৫.৭৩ শতাংশ। সরকার পরিবর্তনের আগে একই বছরের জুন মাসে খেলাপি ঋণ ছিল ২.১১ লক্ষ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১২.৫ শতাংশ। কিছু ব্যবসায়িক গোষ্ঠীকে দীর্ঘমেয়াদি পুনঃতফসিল সুবিধা দেওয়া হলেও খেলাপি ঋণ কমেনি। বরং ব্যাংকগুলোর অনীহা ও দায় এড়ানোর প্রবণতায় আমানতকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ব্যাংক হিসাব যাচাই-বাছাইয়ের ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ স্থগিত রেখেছে। নতুন উদ্যোগ বা সম্প্রসারণে অনাগ্রহের কারণে ঋণপত্র খোলা, কাঁচামাল আমদানি ও শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বাজেট ঘাটতি ও সরকারি রাজস্বে।

ডলারের সংকট, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, দুর্বল কর ব্যবস্থা, ভারী ঋণের বোঝা, রপ্তানি বৈচিত্র্যের অভাব, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক ঘাটতির পাশাপাশি বৈশ্বিক যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাও অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। কিছু সূচকে উন্নতি দেখা গেলেও সাধারণ মানুষের জীবনে তার প্রতিফলন নেই।

সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, সামগ্রিক পরিস্থিতি সন্তোষজনক না হওয়ায় বিনিয়োগ এখনও স্থবির রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ জিডিপির প্রায় ২২ থেকে ২৩ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

বর্তমান সরকার এসব চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে অবগত হলেও এখনো পর্যন্ত দৃশ্যমান ও কার্যকর উদ্যোগ খুব একটা দেখা যায়নি। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বিনিয়োগ আরও সংকুচিত হবে। বিনিয়োগ ছাড়া উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানো সম্ভব নয়, যা সরকারের কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনকে কঠিন করে তুলবে।


এই বিভাগের আরো খবর