ইমদাদুল হক,পাইকগাছা (খুলনা) : শীতের কুয়াশায় ঢেকে থাকা ভোরের আলো। চারদিকে যেন ধূসর আবরণ। এমন মনোরম পরিবেশে পাইকগাছার গ্রামাঞ্চলে দেখা মিলছে এক ব্যস্ততম দৃশ্য—খেজুরগাছের গুড় ও রসের মৌসুমকে ঘিরে গাছিদের দৌড়ঝাঁপ। ভোরের প্রথম আলো ওঠার আগেই শুরু হয় তাদের রস সংগ্রহের কাজ।
গত কয়েকদিন উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, কুয়াশা ভেজা মাঠ পেরিয়ে গাছিরা লাঠি ও দা হাতে গাছের মাথায় উঠছেন। আগের রাতে বসানো মাটির কলসগুলোতে টুপটাপ করে জমেছে তাজা খেজুর রস। কেউ কলস নামাচ্ছেন, কেউ দড়ি বাঁধছেন, আর কেউবা দ্রুতগতিতে রস নিয়ে যাচ্ছেন চুলার দিকে।
স্থানীয় গাছি রহিম মল্লিক বলেন—শীতের কুয়াশামাখা সকাল মানেই আমাদের নতুন ব্যস্ততা। আগের রাতে গাছ চাঁছার পর ভোরে রস নামাতে হয়। যত ঠান্ডা বেশি, তত রসও মিষ্টি হয়। তিনি আরও জানান, প্রতিদিন ভোর সাড়ে পাঁচটার টার দিকেই তারা কাজে নেমে পড়েন।
পাইকগাছার খেজুর রস, পাটালি ও নলেন গুড় জেলার বাইরে বেশ জনপ্রিয়। স্থানীয় কৃষকরা জানান— রসের মৌসুমে তাদের পরিবারে বাড়তি আয়ের হাতছানি থাকে। তবে আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে রসের পরিমাণ কমে যায়, তাতে উৎপাদনেও প্রভাব পড়ে।
গাছিগুলো জানান, বর্তমানে শ্রম ও উপকরণ মূল্য বাড়ায় তাদের লাভ কমে গেছে। তবুও ঐতিহ্য ধরে রাখতেই তারা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। আর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার কারণে গাছগুলো কোনটি বেশি রস দেবে—তা সহজেই বুঝে নেন তারা।
রস সংগ্রহ শেষে তা নিয়ে যাওয়া হয় গুড় তৈরির চুলায়। বাড়ির উঠোনে বড় বড় পাতিলে জ্বলে ওঠে আগুন, তার ধোঁয়া মিশে যায় ভোরের কুয়াশায়। ধীরে ধীরে ফুটতে থাকে তাজা রস, আর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে নলেন গুড়ের মিষ্টি সুগন্ধ।
এ যেন শীতের সকালে গ্রামবাংলার স্বতঃসিদ্ধ এক ছবি—খেজুর রস, কুয়াশা, চুলার ধোঁয়া আর গাছিদের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর পাইকগাছার শীতকালীন জীবন।
কারিম মোল্লা নামে আরেক গাছি বলেন—শীত যত বেশি পড়ে, তত ভালো রস হয়। ভোরের আগে কলস নামাতে হয়। দেরি হলে রস নষ্ট হয়ে যায়। তাই ঘুম ত্যাগ করেই কাজে নেমে পড়তে হয়। তিনি আরও জানান, পাইকগাছার এ অঞ্চলে অনেক পরিবারই রস বিক্রি করে শীতকালীন বাড়তি আয়ের সুযোগ পান।
রাতে গাছ চাঁছার কাজ শেষ করে খেজুর গাছের মাথায় কলস বসিয়ে আসেন গাছিরা। ঠান্ডা হাওয়ায় রস জমে কলস ভরে ওঠে।
স্থানীয় গাছি মিলন গাজী বলেন—একটা গাছ থেকে এক রাতেই এক কলস থেকে দেড় কলস রস পাওয়া যায়। তবে গাছের বয়স আর আবহাওয়া অনেক কিছু নির্ধারণ করে। তার মতে, আগের বছরের তুলনায় এবার রস কিছুটা কম। তাপমাত্রা ঠিকমতো না নামায় রসের মিষ্টতা ও ঘনত্বেও প্রভাব পড়ছে। স্থানীয়দের আনন্দ—‘শীত মানেই রস, নলেন গুড় আর পাটালি’
পাইকগাছার স্থানীয় বাসিন্দা কৃষক রউফ শেখ বলেন—আমরা ছোটবেলা থেকেই শীত মানেই রস খাওয়া। সকালে গরম রসের মিঠে স্বাদ, বিকেলে নলেন গুড়, এ যেন শীতের বড় উপহার। এখনো এই ঐতিহ্য টিকে আছে দেখে ভালো লাগে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক আলমগীর হোসেন বলেন—শিশুদের মাঝে এখনো খেজুর রস নিয়ে আগ্রহ আছে। প্রতিটি শীতেই আমরা পরিবার নিয়ে রস খেতে যাই। কিন্তু গাছি পেশার লোক কমে যাচ্ছে—এটা দুঃখজনক।
চুলার ধোঁয়া আর নলেন গুড়ের সুগন্ধ—গ্রামজীবনের স্বতঃসিদ্ধ দৃশ্য রস সংগ্রহ শেষে তা নিয়ে যাওয়া হয় রস জ্বাল দেওয়ার বড় চুলায়। উপজেলার রাড়ুলী একটি উঠোনে দেখা গেল বড় পাতিলে ফুটছে তাজা খেজুর রস। চুলার ধোঁয়া কুয়াশার সঙ্গে মিশে এক অপূর্ব আবহ তৈরি করেছে। গরম রস ধীরে ধীরে নলেন গুড়ে রূপ নিচ্ছে।
গুড় প্রস্তুতকারক ছালাম দফাদার জানান—রস ভালো হলে গুড়ও ভালো হয়। আমাদের এখানে তৈরি গুড় পাইকগাছার বাইরে খুলনা, বাগেরহাট, এমনকি ঢাকায়ও চলে যায়।
গাছিরা জানান, লাঠি, দা, দড়ি, কলস—সব কিছুর দামই এখন বেশি। তাছাড়া গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় রস সংগ্রহ কমছে। আগে প্রতিটি বাড়ির পাশে খেজুর গাছ ছিল। এখন সেই সংখ্যা কমে যাচ্ছে। আমরা পেশা ধরে রাখতে চাই, কিন্তু লাভ আগের মতো নেই।