1. admin@dakshinanchal24.com : admin@dakshinanchal24.com :
রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:২২ অপরাহ্ন

সীতাকুণ্ডে বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু, ৪৮ ঘণ্টায়ও হয়নি মামলা

Reporter Name
  • Update Time : রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৬
🖼️ ফটো কার্ড তৈরি করুন

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে অচেতন হয়ে ৯ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় শিপইয়ার্ডটির সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়া এবং কর্মপরিবেশ নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত এ স্থগিতাদেশ বহাল থাকবে। দুর্ঘটনার ৪৮ ঘণ্টা পার হলেও এখন পর্যন্ত সীতাকুণ্ড থানায় কোনো মামলা হয়নি।

গত শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে ভাটিয়ারী স্টেশন রোডসংলগ্ন সাগর উপকূলে অবস্থিত ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে এ দুর্ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী ও উদ্ধারকাজে জড়িত শ্রমিকদের তথ্য অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ৮টার দিকে এলএনজি বা এলপিজি বহনকারী ‘এমটি রাসি’ নামের একটি জাহাজের ট্যাংকের অংশ কাটার কাজ শুরু হয়।

একজন কাটারম্যান ট্যাংকের চারপাশ কাটার পর বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হতে শুরু করে। কিছুক্ষণের মধ্যে কাজ করা দুই শ্রমিক অচেতন হয়ে পড়েন। তাঁদের উদ্ধারে এগিয়ে গেলে আরও দুই শ্রমিক গ্যাসের বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হন। পরে কারখানার ফোরম্যান এবং নিরাপত্তা মাস্ক পরা সেফটি অফিসারও ঘটনাস্থলে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন।

দুর্ঘটনায় নিহত ৯ জন হলেন সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের মৌলভীপাড়া ও শনি ঠাকুরবাড়ি এলাকার দুই সহোদর মনসুর উদ্দিন (৪০) ও নাসির উদ্দিন (৩৮), পলাশ জলদাস (৩০), সানি জলদাস (২২), মতিউর রহমান সাজ্জাদ (২০), হাবিবুর রহমান (৫০), গাইবান্ধার মো. রানা মিয়া ও খোকন এবং শিপইয়ার্ডটির সেফটি অফিসার পাবনার বাসিন্দা আব্দুল আলিম সুজন (৩৮)। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন।

নিহত ৯ জনের মধ্যে আটজনের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। শুধু সেফটি অফিসার আব্দুল আলিম সুজনের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, নিহতদের স্বজনেরা লিখিতভাবে ময়নাতদন্ত না করার আবেদন করেন এবং কোনো অভিযোগ করতে চাননি। তাঁদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সুরতহাল শেষে মরদেহগুলো হস্তান্তর করা হয়।

নিহত দুই ভাইয়ের ভগ্নিপতি মো. মহিউদ্দিন বলেন, “শুক্রবার অনেক দেরি হয়ে যাওয়ায় লাশ দ্রুত বাড়িতে নিয়ে দাফন করা ছাড়া উপায় ছিল না। তবে পরবর্তীতে কোনো প্রয়োজন হলে আমরা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করার কথা জানিয়েছি। আপাতত আমরা মামলা-মোকদ্দমায় যেতে চাচ্ছি না।”

এদিকে দুর্ঘটনার ৪৮ ঘণ্টা পার হলেও সীতাকুণ্ড থানায় কোনো এজাহার জমা পড়েনি। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, লিখিত অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়া হস্তান্তরের বিষয়ে আইন বিশেষজ্ঞ ও শ্রমিক নেতাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের মহাসচিব অ্যাডভোকেট এ এইচ এম জিয়া হাবীব আহসান বলেন, অবহেলাজনিত বা কাঠামোগত অবহেলার কারণে মৃত্যু হলে সুরতহাল ও পোস্টমর্টেম রিপোর্ট গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। তাঁর মতে, পোস্টমর্টেম না থাকলে ভবিষ্যতে আদালতে কারখানার মালিকদের ফৌজদারি দায় প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের (টিইউসি) চট্টগ্রাম সভাপতি তপন দত্ত ঘটনাটিকে “আইনি পথ রুদ্ধ করার চক্রান্ত” বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর অভিযোগ, নিহত শ্রমিকদের স্বজনেরা আতঙ্কিত। মালিকপক্ষ শাস্তি না পেলে এবং নিরাপত্তা প্রটোকল যথাযথভাবে অনুসরণ না করলে এ ধরনের দুর্ঘটনা আবারও ঘটতে পারে।

স্থানীয় শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের আরও অভিযোগ, দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোকে চাপ দেওয়া এবং মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণের প্রলোভন দেখিয়ে পুলিশি বা আইনি প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখা হচ্ছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে মালিকপক্ষের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড (বিএসআরবি) ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডের সব ধরনের জাহাজ ভাঙা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়া এবং কর্মপরিবেশ নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত কার্যক্রম বন্ধ থাকবে বলে জানানো হয়েছে।

দুর্ঘটনার কারণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি অনুসন্ধানে তিনটি পৃথক তদন্ত কমিটি কাজ করছে। এর মধ্যে শিল্প মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দল, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি এবং বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইকেলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) নিজস্ব প্রতিনিধি দল রয়েছে।

প্রাথমিক পর্যায়ে গ্যাস বহনকারী স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার আগে সেটিকে সম্পূর্ণ গ্যাসমুক্ত হিসেবে সনদ নেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা যথাযথভাবে পালন করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

সরকারি বিস্ফোরক পরিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক পরিদর্শনে দুর্ঘটনাস্থলে হাইড্রোজেন সালফাইড, কার্বন ডাই অক্সাইড, মিথেন ও অ্যামোনিয়ার মতো ক্ষতিকর বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

এদিকে দুর্ঘটনার পর শোকাহত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ান বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা অধ্যাপক আসলাম চৌধুরী এফসিএ। তিনি নিহতদের জানাজায় অংশ নেন, স্বজনদের বাড়িতে যান এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত শ্রমিকদের খোঁজ নেন। পরে রাত প্রায় ১১টার দিকে দুর্ঘটনাস্থলও পরিদর্শন করেন তিনি। সেখানে নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি ও সুরক্ষাসামগ্রীর অনুপস্থিতি দেখে দুর্ঘটনার নিরপেক্ষ আইনি তদন্ত, দায়ীদের শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণ দাবি করেন।

তবে শিপব্রেকিং খাতের প্রভাবশালী সংগঠন বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লিং অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের অভিযোগ, সংগঠনের সভাপতি মহসিন চৌধুরীসহ শীর্ষ নেতাদের নিহতদের পরিবারের পাশে, হাসপাতালে আহতদের দেখতে কিংবা দুর্ঘটনাস্থলে দেখা যায়নি।

বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) চট্টগ্রাম জেলার প্রধান আল কাদেরী জয় ঘটনাটিকে “স্বাভাবিক দুর্ঘটনা নয়, বরং কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড” বলে বর্ণনা করেছেন।

সীতাকুণ্ডের শিপব্রেকিং শিল্পে শ্রমিক নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সীতাকুণ্ড উপকূলবর্তী প্রায় ১৫০টি নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ইয়ার্ডে গত পাঁচ বছরে ১৭৯টি ছোট-বড় দুর্ঘটনায় অন্তত ৩৮ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে গ্রিন শিপব্রেকিংয়ে রূপান্তরের দাবি থাকলেও মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও গ্যাস নির্গমন পরীক্ষার অবহেলা শ্রমিকদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

আরো খবর দেখুন
© All rights reserved © 2018
Design By BDit.com.bd