পাইকগাছা ( খুলনা ) প্রতিনিধি: খুলনার পাইকগাছা উপজেলার লতা ইউনিয়নে দেশের প্রচলিত আইন ও নীতিমালার তোয়াক্কা না করে সরকারি জমি, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও অর্পিত (ভিপি) সম্পত্তি দখল করে বিলাসবহুল বাগানবাড়ি ও বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। একটি নদীর গতিপথ রোধ ও সরকারি সম্পত্তি গ্রাস করার এই প্রক্রিয়ায় মূল অভিযুক্ত হিসেবে নাম এসেছে লতা ইউনিয়নের বর্তমান ইউপি সদস্য কুমারেশ মন্ডল ও তার ভাই প্রশান্ত মন্ডলের বিরুদ্ধে। বিগত সরকারের আমলে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এই চক্রটি একের পর এক সরকারি সম্পত্তি ও স্থানীয়দের জমি নিজেদের কবজায় নিয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। সর্বশেষ ইউপি নির্বাচনে কুমারেশ মন্ডল মেম্বার নির্বাচিত হওয়ার পর এই দখল প্রক্রিয়া আরও বেপরোয়া রূপ নেয়।
সরকারি গেজেট অনুযায়ী, লতা ইউনিয়নের উলুবুনিয়া নদীটির মোট আয়তন ৫৫.৮৯ একর। কিন্তু অবাধ দখল আর অবৈধ বাঁধের কারণে মাত্র কয়েক বছরে নদীটি প্রায় ভরাট হয়ে গেছে। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, নদী অববাহিকার আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকার কালভার্টের মুখটির কাছে কুমারেশ ও প্রশান্ত মন্ডলের বিলাসবহুল বাড়ির সীমানা করা হয়েছে, যা নদীর অপর পাড় পর্যন্ত ঠেকেছে। গত ২০১৮ ও ২০২১ সালে নদীটির পানির প্রবাহ সচল রাখতে সরকারি অর্থায়নে খনন প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও, ক্ষমতার বলে মূল গতিপথকে আড়াল করে নামমাত্র খননকাজ শেষ দেখিয়ে নদী ভরাট করে এই সিন্ডিকেট নিজেদের সীমানা আরও প্রসারিত করেছে।
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নদী দখল ছাড়াও বিস্তর ভূমি গ্রাসের অভিযোগ রয়েছে। তারা শামুকপোতা বাজারে মন্দির সংলগ্ন প্রধান সড়কের পাশে সরকারি বিধিনিষেধ তোয়াক্কা না করে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন তৈরি করেছে।কুমারেশ ও প্রশান্ত বর্তমানে যে জায়গায় বসবাস করছেন এবং তার সামনে থাকা ৯ বিঘা জমি—সেটি মূলত সুদীপ্ত মন্ডল নামের এক ব্যক্তির সরকারি বন্দোবস্তের (ডিসিআর) জায়গা। প্রথমে তারা জমিটি ‘হারি’ (লিজ) হিসেবে নিলেও এখন তা সম্পূর্ণ নিজেদের দখলে নিয়েছেন। প্রভাবশালী এই চক্রের ক্ষমতার দাপটে এলাকায় সাধারণ মানুষ মুখ খুলতে সাহস পান না।
ভূমি ও নদী দখলের এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত প্রশান্ত মন্ডল দাবি করেন যে তারা সরকারি জমি লিজ নিয়েছেন। তবে এর সপক্ষে কোনো বৈধ কাগজপত্র তিনি দেখাতে পারেননি। জমির মালিকানার নথিপত্র দেখতে চাওয়া হলে তিনি দাবি করেন, গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হলে তার বাড়িতে আগুন দিয়ে সব কাগজপত্র পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা লতা ইউনিয়নের বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ইব্রাহীম গাজী এর সাথে কথা হলে তিনি বলেন, “এটা নদীর জায়গা না। এই জমি আকবর (ওরফে) আকু মেম্বারের ডিসিআর কাটা। উনার কাছ থেকে অনেক আগে প্রশান্তরা লিজ নিয়ে করে। তিনি আরো বলেন ডিসিআর এর জমি হস্তান্তর যোগ্য নয়, তার পরেও সাব লিজ নিয়ে আমরা করি।”
এই বিষয়ে পাইকগাছা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফজলে রাব্বী বলেন, “সরকারি সম্পত্তি বা নদী দখল করার কোনো সুযোগ নেই। লতা ইউনিয়নে সরকারি ভিপি সম্পত্তি ও নদী অববাহিকা দখলের বিষয়টি খতিয়ে দেখে দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী জানান, বিষয়টা জানা ছিল না, তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
প্রকাশ্য দিবালোকে একটি নদীর অস্তিত্ব সংকটে ফেলে এবং সরকারি ভিপি সম্পত্তি দখল করে বিলাসবহুল স্থাপনা নির্মাণের এই ঘটনায় এলাকার সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। পরিবেশ রক্ষা ও আইনের শাসন সমুন্নত রাখতে এলাকাবাসী অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে এই সম্পত্তি সরকারি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন।