চাঁদাবাজির মামলায় সকালে রিমান্ডে নেওয়ার আদেশ, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেই আদেশ বাতিল করে জামিন এবং সন্ধ্যার মধ্যেই কারামুক্তি। আলোচিত ‘জুলাইযোদ্ধা’ তাহরিমা জান্নাত সুরভীর ক্ষেত্রে একই দিনে এমন নাটকীয় ঘটনা ঘটেছে। রোববার (৫ জানুয়ারি) সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে তিনি গাজীপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান।
এর আগে ওই দিন দুপুরে গাজীপুর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২–এর বিচারক সৈয়দ ফজলুল মাহাদী শুনানি শেষে একটি চাঁদাবাজির মামলায় সুরভীর দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কালিয়াকৈর থানার এসআই ওমর ফারুক পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিলেন। আদালতের এ আদেশ ঘিরে সকাল থেকেই জজ কোর্ট প্রাঙ্গণে সুরভীর সমর্থকরা জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন।
রিমান্ড আদেশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মোড় নেয় পরিস্থিতি। অতিরিক্ত জেলা দায়রা জজ-১–এর বিচারক অমিত কুমার দে রিমান্ড আদেশ বাতিল করে সুরভীর চার সপ্তাহের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন মঞ্জুর করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করে সুরভীর আইনজীবী ও গাজীপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান কামাল বলেন, “দুপুরের রিমান্ড আদেশের বিরুদ্ধে আমরা দায়রা জজ আদালতে রিভিশন করি। শুনানি শেষে আদালত বয়স ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় নিয়ে রিমান্ড বাতিল করে আমার জিম্মায় চার সপ্তাহের জামিন দিয়েছেন।”
জামিনের কাগজপত্র দ্রুত কারাগারে পৌঁছালে সন্ধ্যার মধ্যেই মুক্তি পান সুরভী। কারামুক্তির খবরে গাজীপুর আদালতপাড়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর সমর্থকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়।
এই মামলার সূত্রপাত গত ২৪ ডিসেম্বর দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে। ওই সময় গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গীতে যৌথবাহিনীর অভিযানে নিজ বাসা থেকে সুরভীকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের সময় তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। পুলিশ ঘুম থেকে তুলে তাঁকে নিয়ে যাওয়ার একটি ভিডিও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। পুলিশ জানায়, সাংবাদিক নাইমুর রহমান দুর্জয়ের করা একটি চাঁদাবাজির মামলায় তিনি পরোয়ানাভুক্ত আসামি।
পুলিশের রেকর্ড অনুযায়ী, ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে কালিয়াকৈর থানায় মামলাটি দায়ের করেন নাঈমুর রহমান দুর্জয়। এজাহারে সুরভীর বয়স ২১ বছর উল্লেখ করা হয়। তবে আদালতপাড়ায় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু থেকেই তাঁর বয়স নিয়ে প্রশ্ন তোলেন জুলাইযোদ্ধারা। তাঁদের দাবি, সুরভী অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং বয়স গোপন করে তাঁকে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
রোববার আদালতে তোলার সময়ও উত্তেজনা ছড়ায়। রিমান্ড আদেশের পর গারদখানা থেকে প্রিজন ভ্যানে তোলার সময় সুরভী চিৎকার করে বলেন, “কোনো তদন্ত ছাড়াই আমারে রিমান্ড দিছে। ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে কোনো তদন্ত রিপোর্ট দেওয়া হয়নি।” এ সময় আদালতপাড়ায় জড়ো হওয়া আন্দোলনকারীরা রিমান্ড বাতিল ও নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে স্লোগান দেন।
সুরভীর বয়স যাচাই নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ওমর ফারুক বলেন, “আসামিকে গ্রেপ্তারের পর পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিলাম, আদালত দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বয়স সংক্রান্ত তথ্য-প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হবে।” তবে গ্রেপ্তারের ১১ দিন পরও প্রকৃত বয়স যাচাই না করার বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন জানান, এজাহারে বয়স ২১ বছর উল্লেখ থাকায় আলাদা করে খোঁজ নেওয়া হয়নি। “এখন বিতর্ক ওঠায় আসামির পরিবারের কাছে জন্মনিবন্ধন চাওয়া হয়েছে এবং অনলাইনে যাচাই করা হবে,” বলেন তিনি।
গাজীপুর জেলা আইনজীবী সমিতির এক আইনজীবী জানান, পুলিশ প্রতিবেদনে যে বয়স উল্লেখ থাকে, আদালত সাধারণত সেটির ভিত্তিতেই আদেশ দেন। বয়স কম হওয়ার বিষয়টি আদালতের নজরে এলে রিমান্ড বাতিল ও জামিন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মামলার বাদীর একাধিক অডিও রেকর্ড ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে বাদী সুরভীকে অনৈতিক প্রস্তাব দিয়েছেন বলে শোনা যায়। এসব অডিও শেয়ার করে অনেক জুলাইযোদ্ধা দাবি করছেন, সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় তাঁকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।
গাজীপুরের পুলিশ সুপার মো. শরীফ উদ্দিন বলেন, “মামলাটি আমার দায়িত্ব নেওয়ার আগের। বিষয়টি জেনেছি। কোনো ধরনের অবিচার যেন না হয়, আমি ব্যক্তিগতভাবে দেখব। আশা করছি একটি ন্যায্য সমাধান হবে।”