Dhaka ১১:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬, ২২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

  ঝুপড়ি ঘরে মানবেতর জীবন: বাগেরহাটে পাঁচ বছরেও সরকারি সহায়তা মেলেনি বৃদ্ধ-দম্পতির

  • Reporter Name
  • Update Time : ১২:২১:৩০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৮ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ৭৬ Time View

এম.পলাশ শরীফ, বাগেরহাট প্রতিবেদক : ছেঁড়া পলিথিনে মোড়ানো তার ছাউনি। হোগলা আর নারকেল পাতার বেড়া বসবাস করছেন বাগেরহাটের বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের কোড়ামারা গ্রামে দম্পতি মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ঘরের অর্ধেক অংশই হেলে পড়েছে। একটু বাতাস হলেই পাখির বাসার মতো উড়ে যাবে এই ঝুপড়ি। আর এই ঝুপড়ি ঘরেই দিন কাটে গোকুল সরদার আর তাঁর স্ত্রী লক্ষ্মী রানী সরদার দম্পতির ।

দারিদ্র্যের দুষ্ট চক্রে একে অপরের সঙ্গ ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট নেই তাদের। একমাত্র পলিথিনে মোড়ানো এই ঝুপড়ি ঘরটিউ তাদের জীবনের শেষ আশ্রয়। এখানে প্রতিনিয়তই বৃষ্টি ঢোকে, বাতাস ঢোকে, শীতের কনকনে হাওয়া ঢোকে, কিন্তু আশার আলো কখনই ঢোকে না।

গোকুল সরদারের বয়স ৭৮ আর ৬০ বছরের লক্ষ্মীর জীবনে সুখের কোনো স্মৃতি নেই। তাদের জীবনে আছে শুধু সংগ্রাম, অনাহার, বঞ্চনা আর বেদনার গল্প। বয়সের ভারে হাঁটাচলা কঠিন হলেও, খিদের যন্ত্রনা পিছু ছাড়ে না। তাই কখনো দিনমজুরি, কখনো প্রতিবেশীর বাড়িতে কাজ যা পান, তাই দিয়ে দু’মুঠো ভাতের ব্যবস্থা করেন। তবে  অনেক রাতই  কেটে যায় ক্ষুধার বিরুদ্ধে লড়াই করে।
তবুও তাঁরা কারও কাছে হাত পাতেননি। নিজের ঘাম, নিজের শ্রম বিক্রি করে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন । কিন্তু এখন বয়সের কাছে হেরে গেছেন। কাজের শক্তি নেই, পথচলার জোর নেই। আর সেই সঙ্গে প্রায় ভেঙে পড়ছে তাঁদের একমাত্র ঘরটিও। রাতভর বাতাসে দুলতে থাকে ছেঁড়া পলিথিন। বৃষ্টি আর শীতের রাতের শিশিরে বিছানা ভিজে যায়, পোশাক ভিজে যায়, শরীর ভিজে যায়। সকালের রোদ তাদের পোশাক শুকিয়ে দিলেও, তাদের অন্তরের ক্ষত কখনই শুকায় না।

কান্নাজড়িত কন্ঠে লক্ষ্মী রানী বলছিলেন, আমাদের মত এমন অসহায় আশেপাশে কোথাও নাই। বর্ষাকালে সারারাত ঘুমাতে পারিনি। আমাদের সবকিছু ভিজে গেছে। পলিথিন মুড়ি দিয়ে খেয়ে না খেয়ে রাত কাটিয়েছি।  চেয়ারম্যান মেম্বারদের কাছে অনেকবার গিয়েছি।  আমরা আশ্বাস ছাড়া আর কিছুই পাইনি। এই শীতের সময় ভাঙ্গা বেড়া দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঢোকে, উপর থেকে শিশির পড়ে আমাদের বিছানা ভিজে যায়। আমরা নিজেরাই ঠিকমত খাবার খেতে পারি না, ঘর মেরামত করবো কি দিয়ে? আমার স্বামী দিনমজুরি করে যা পায় তাই দিয়ে খেয়ে না খেয়ে বেঁচে আছি। জীবনের শেষ বয়সে এসে একটু মাথা গোজার ঠাঁই ছাড়া কিছুই চাওয়ার নেই।

গোকুল সরদার বলেন, “আমরা খুবই অসহায় মানুষ। তারপরও কারো কাছ থেকে হাত পেতে কিছুই নেই নি। এখনো পর্যন্ত দিনমজুরি করে যা পাই তাই দিয়ে দুবেলা খাই,  না পেলে না খেয়ে থাকি। বিগত সরকারের সময় ঘর দিছে শুনে একটি ঘর পাবার জন্য চেয়ারম্যান, মেম্বার, টিএনও অফিসে অনেকবার ঘুরেছি । সবাই আশ্বাস দিলেও বাস্তবে কিছুই পাইনি”।

এই দম্পতির মানবেতর জীবনযাপন চোখের সামনে থাকলেও সরকারি সহায়তা না মেলায় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে স্থানীয় মানুষদের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ক্ষোভ। স্থানীয় বাসিন্দা সাগর দাস, জালাল শেখ, সেকেন্দার সহ একাধিক ব্যক্তি বলেন, এই ঝুপড়ি ঘরে এই দুই দম্পতি মানবতার জীবন যাপন করে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়,  চেয়ারম্যান মেম্বার বহুত আসছে গেছে কিন্তু এই অসহায় দম্পতিকে কেউ দেখেনি। অনেকের অনেক কিছু থাকার পরেও তারা ঘর পেয়েছে। প্রকৃতপক্ষে তারা ঘর পাওয়ার যোগ্য হলেও তাদেরকে ঘর দেয়া হয়নি। এই ঝুপড়ি ঘরটি ঘরটি যেকোনো সময় পড়ে গিয়ে তারা চাপা পড়তে পারে। সরকার এবং বিত্তশালীদের কাছে তাদের একটি ঘর তৈরি করে দেয়ার জন্য আবেদন জানান তারা।

Tag :
About Author Information

জনপ্রিয়

মোরেলগঞ্জে আগুন, ৩০ লাখ টাকার মালামাল পুড়ে ছাই

  ঝুপড়ি ঘরে মানবেতর জীবন: বাগেরহাটে পাঁচ বছরেও সরকারি সহায়তা মেলেনি বৃদ্ধ-দম্পতির

Update Time : ১২:২১:৩০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৮ ডিসেম্বর ২০২৫

এম.পলাশ শরীফ, বাগেরহাট প্রতিবেদক : ছেঁড়া পলিথিনে মোড়ানো তার ছাউনি। হোগলা আর নারকেল পাতার বেড়া বসবাস করছেন বাগেরহাটের বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের কোড়ামারা গ্রামে দম্পতি মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ঘরের অর্ধেক অংশই হেলে পড়েছে। একটু বাতাস হলেই পাখির বাসার মতো উড়ে যাবে এই ঝুপড়ি। আর এই ঝুপড়ি ঘরেই দিন কাটে গোকুল সরদার আর তাঁর স্ত্রী লক্ষ্মী রানী সরদার দম্পতির ।

দারিদ্র্যের দুষ্ট চক্রে একে অপরের সঙ্গ ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট নেই তাদের। একমাত্র পলিথিনে মোড়ানো এই ঝুপড়ি ঘরটিউ তাদের জীবনের শেষ আশ্রয়। এখানে প্রতিনিয়তই বৃষ্টি ঢোকে, বাতাস ঢোকে, শীতের কনকনে হাওয়া ঢোকে, কিন্তু আশার আলো কখনই ঢোকে না।

গোকুল সরদারের বয়স ৭৮ আর ৬০ বছরের লক্ষ্মীর জীবনে সুখের কোনো স্মৃতি নেই। তাদের জীবনে আছে শুধু সংগ্রাম, অনাহার, বঞ্চনা আর বেদনার গল্প। বয়সের ভারে হাঁটাচলা কঠিন হলেও, খিদের যন্ত্রনা পিছু ছাড়ে না। তাই কখনো দিনমজুরি, কখনো প্রতিবেশীর বাড়িতে কাজ যা পান, তাই দিয়ে দু’মুঠো ভাতের ব্যবস্থা করেন। তবে  অনেক রাতই  কেটে যায় ক্ষুধার বিরুদ্ধে লড়াই করে।
তবুও তাঁরা কারও কাছে হাত পাতেননি। নিজের ঘাম, নিজের শ্রম বিক্রি করে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন । কিন্তু এখন বয়সের কাছে হেরে গেছেন। কাজের শক্তি নেই, পথচলার জোর নেই। আর সেই সঙ্গে প্রায় ভেঙে পড়ছে তাঁদের একমাত্র ঘরটিও। রাতভর বাতাসে দুলতে থাকে ছেঁড়া পলিথিন। বৃষ্টি আর শীতের রাতের শিশিরে বিছানা ভিজে যায়, পোশাক ভিজে যায়, শরীর ভিজে যায়। সকালের রোদ তাদের পোশাক শুকিয়ে দিলেও, তাদের অন্তরের ক্ষত কখনই শুকায় না।

কান্নাজড়িত কন্ঠে লক্ষ্মী রানী বলছিলেন, আমাদের মত এমন অসহায় আশেপাশে কোথাও নাই। বর্ষাকালে সারারাত ঘুমাতে পারিনি। আমাদের সবকিছু ভিজে গেছে। পলিথিন মুড়ি দিয়ে খেয়ে না খেয়ে রাত কাটিয়েছি।  চেয়ারম্যান মেম্বারদের কাছে অনেকবার গিয়েছি।  আমরা আশ্বাস ছাড়া আর কিছুই পাইনি। এই শীতের সময় ভাঙ্গা বেড়া দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঢোকে, উপর থেকে শিশির পড়ে আমাদের বিছানা ভিজে যায়। আমরা নিজেরাই ঠিকমত খাবার খেতে পারি না, ঘর মেরামত করবো কি দিয়ে? আমার স্বামী দিনমজুরি করে যা পায় তাই দিয়ে খেয়ে না খেয়ে বেঁচে আছি। জীবনের শেষ বয়সে এসে একটু মাথা গোজার ঠাঁই ছাড়া কিছুই চাওয়ার নেই।

গোকুল সরদার বলেন, “আমরা খুবই অসহায় মানুষ। তারপরও কারো কাছ থেকে হাত পেতে কিছুই নেই নি। এখনো পর্যন্ত দিনমজুরি করে যা পাই তাই দিয়ে দুবেলা খাই,  না পেলে না খেয়ে থাকি। বিগত সরকারের সময় ঘর দিছে শুনে একটি ঘর পাবার জন্য চেয়ারম্যান, মেম্বার, টিএনও অফিসে অনেকবার ঘুরেছি । সবাই আশ্বাস দিলেও বাস্তবে কিছুই পাইনি”।

এই দম্পতির মানবেতর জীবনযাপন চোখের সামনে থাকলেও সরকারি সহায়তা না মেলায় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে স্থানীয় মানুষদের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ক্ষোভ। স্থানীয় বাসিন্দা সাগর দাস, জালাল শেখ, সেকেন্দার সহ একাধিক ব্যক্তি বলেন, এই ঝুপড়ি ঘরে এই দুই দম্পতি মানবতার জীবন যাপন করে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়,  চেয়ারম্যান মেম্বার বহুত আসছে গেছে কিন্তু এই অসহায় দম্পতিকে কেউ দেখেনি। অনেকের অনেক কিছু থাকার পরেও তারা ঘর পেয়েছে। প্রকৃতপক্ষে তারা ঘর পাওয়ার যোগ্য হলেও তাদেরকে ঘর দেয়া হয়নি। এই ঝুপড়ি ঘরটি ঘরটি যেকোনো সময় পড়ে গিয়ে তারা চাপা পড়তে পারে। সরকার এবং বিত্তশালীদের কাছে তাদের একটি ঘর তৈরি করে দেয়ার জন্য আবেদন জানান তারা।