1. admin@dakshinanchal24.com : admin@dakshinanchal24.com :
সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৫৩ অপরাহ্ন

মানহীন ওষুধের ছড়াছড়ি ঠেকাতে বাড়ছে নজরদারি

Reporter Name
  • Update Time : সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬
🖼️ ফটো কার্ড তৈরি করুন

দেশে জীবনরক্ষাকারী ওষুধের নামে নিম্নমানের, অননুমোদিত, মেয়াদোত্তীর্ণ ও ভেজাল পণ্যের অনিয়ন্ত্রিত বিক্রি ঠেকাতে কঠোর অবস্থান ও নজরদারি বহুগুণ বাড়িয়েছে প্রশাসন। জেনেশুনে নকল ওষুধ বানিয়ে বাজারজাত করার মতো মারাত্মক অপরাধ রোধে মাঠে নেমেছে সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ওষুধ প্রশাসন। এরই ধারাবাহিকতায় জীবনরক্ষাকারী ওষুধের নামে নিম্নমানের, অননুমোদিত, মেয়াদোত্তীর্ণ, ভেজাল ও প্রয়োজনহীন ওষুধের অনিয়ন্ত্রিত বিক্রি ঠেকাতে উৎপাদন থেকে শুরু করে খুচরা বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কঠোর নজরদারি ও আইনি ব্যবস্থা জোরদার করছে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর (ডিজিডিএ)। একই সঙ্গে মাঠে নেমেছে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। রোগীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ওষুধের উৎপাদন, পরিবহন, সংরক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, দেশের মানুষের জন্য মানসম্মত ও নিরাপদ ওষুধ নিশ্চিত করতে কাঁচামাল (এপিআই) থেকে শুরু করে প্রস্তুতকৃত ওষুধ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে রাসায়নিক অপদ্রব্য ও বিষাক্ততা পরীক্ষার আওতায় আনা হচ্ছে। বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৩২২টি, যার মধ্যে সক্রিয় রয়েছে ২৫৮টি। এর মধ্যে শীর্ষ প্রায় ৩০টি ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস (জিএমপি) অনুসরণ করে সিংহভাগ মানসম্মত ওষুধ উৎপাদন করে আসছে; যাদের মোট উৎপাদন কারখানার সংখ্যা প্রায় ১০০টি। কিন্তু সক্রিয় বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অংশ এবং অসাধু চক্রের মানহীন ওষুধ বাজারজাতকরণ রুখতে এখন স্থানীয় বাজারের ওষুধের কার্যকারিতা ও বায়োইকুইভ্যালেন্স (ইরড়বয়ঁরাধষবহপব) পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। সমপ্রতি এক আলোচনা সভায় ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. আলমগীর হোসেন জানান, ওষুধ অন্য কোনো সাধারণ ভোগ্যপণ্য নয়। মানহীন ও অপ্রয়োজনীয় ওষুধ প্রতিরোধ এবং অসংক্রামক ব্যাধিতে ভোগা রোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে উৎপাদন ছাড়াও সঠিকভাবে সঠিক তাপমাত্রায় ওষুধ পরিবহন ও বিতরণে ‘গুড ডিস্ট্রিবিউশন প্র্যাকটিস’ (জিডিপি) ও ডব্লিউএইচওর নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলা হচ্ছে। এ ছাড়া ‘ওষুধ ও প্রসাধনী আইন, ২০২৩’ অনুযায়ী ওষুধ প্রস্তুতকারকদের ফার্মাকোভিজিল্যান্স বা ওষুধের বিরূপ প্রতিক্রিয়া নজরদারির আইনি বাধ্যবাধকতা জোরদার করা হচ্ছে, যাতে ওষুধের প্যাকেটেও সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ তথ্য উল্লেখ থাকে। নজরদারির এই প্রক্রিয়ায় দেশের ফার্মেসি খাতকেও বড় ধরনের নিয়মনীতির মধ্যে আনা হচ্ছে। বর্তমানে দেশে প্রায় সোয়া দুই লাখ ফার্মেসি রয়েছে, যার মধ্যে নিবন্ধিত ফার্মেসির সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার। বাকি লাইসেন্সবিহীন ও অননুমোদিত ফার্মেসিগুলোর বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান জোরদারের পাশাপাশি রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রির ওপর পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক ও নীতিগত এই কঠোরতার পাশাপাশি খুচরা বাজারে সরাসরি অভিযান চালিয়ে জাল বুনে থাকা অসাধু সিন্ডিকেটকে চিহ্নিত করা হচ্ছে। সমপ্রতি রাজধানীর কোতোয়ালি থানাধীন বাবুবাজার এলাকায় চার ঘণ্টার এক চিরুনি অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অননুমোদিত ও নকল ওষুধ জব্দ ও ধ্বংস করেছে সিকিউরিটি অ্যান্ড রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। এসআরবি সদর দপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ওষুধ প্রশাসনের সহায়তায় পরিচালিত ওই ভ্রাম্যমাণ আদালতে বিএসটিআই ও ওষুধ প্রশাসনের অনুমোদনবিহীন, মেয়াদোত্তীর্ণ এবং নকল ওষুধ মজুদ ও বিক্রির দায়ে ১০ টি দোকান মালিককে ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই সঙ্গে আরও ৪টি দোকান থেকে মানহীন ও অননুমোদিত ওষুধ জব্দ করে ঘটনাস্থলেই ধ্বংস করা হয়। এসআরবি স্পষ্ট জানিয়েছে, জনস্বার্থে ভেজাল ও প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তাদের এই অভিযান নিয়মিত অব্যাহত থাকবে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকার ওষুধ বিক্রির বৃহত্তম পাইকারি মার্কেট মিটফোর্ড, বাবুবাজার ও ইসলামপুর এলাকাকে কেন্দ্র করে প্রায় অর্ধশতাধিক অসাধু ব্যবসায়ীর সমন্বয়ে গঠিত একটি শক্ত সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি অলিগলি এবং কেরানীগঞ্জের গোপন কারখানায় দেশি-বিদেশি বিভিন্ন নামিদামি ব্র্যান্ডের ওষুধ হুবহু নকল করে তৈরি করা হচ্ছে। পরবর্তীতে মিটফোর্ড ও বাবুবাজারের পাইকারি বাজারকে প্রধান হাব বানিয়ে তা কুরিয়ারের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ফার্মেসিগুলোতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা নকল ও মানহীন ওষুধের বিস্তারকে সরাসরি ‘হত্যার শামিল অপরাধ’ বলে গণ্য করছেন। কিডনি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট কিডনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশীদ জানান, ভেজাল ও কার্যকারিতাহীন ওষুধ সেবনের সরাসরি প্রভাব পড়ে মানবদেহের কিডনিতে। মানহীন উপাদানের বিষাক্ততায় দ্রুত কিডনি ফেইলিউর ঘটে, যা দেশে আশঙ্কাজনক হারে কিডনি রোগীর সংখ্যা বাড়াচ্ছে। তিনি কেবল নতুন হাসপাতাল বানানোর দিকে নজর না দিয়ে ভেজাল ও মানহীন ওষুধের মূল উৎস নির্মূল করার জোর দাবি জানান। একইভাবে শিশুরা নকল ওষুধের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন ঢাকা শিশু হাসপাতালের নিউনেটাল বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মনির হোসেন এবং সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. সফি আহমেদ মোয়াজ। তারা জানান, জ্বর বা সাধারণ সংক্রমণের চিকিৎসায় শিশুদের দেওয়া প্যারাসিটামল কিংবা অ্যান্টিবায়োটিক কাজ না করায় শিশুর শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অকেজো হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন পর্যায়ে ডিজিডিএ-র কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ, ফার্মেসিগুলোতে প্রশিক্ষিত ফার্মাসিস্টের উপস্থিতি, অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রিতে শূন্য সহনশীলতা এবং বাজার পর্যায়ে এসআরবি ও ওষুধ প্রশাসনের অব্যাহত যৌথ অভিযানের মাধ্যমেই কেবল দেশের চিকিৎসা সুরক্ষায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

আরো খবর দেখুন
© All rights reserved © 2018
Design By BDit.com.bd