1. admin@dakshinanchal24.com : admin@dakshinanchal24.com :
বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৬ অপরাহ্ন

‎জলবায়ুর নিষ্ঠুর শাস্তি মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়ার ঝুঁকিতে দক্ষিঞ্চল, লাখো মানুষের অস্তিত্বের লড়াই

Reporter Name
  • Update Time : বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২৬
🖼️ ফটো কার্ড তৈরি করুন
‎ইমদাদুল হক, পাইকগাছা (খুলনা): ‎ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ,ঘূর্ণিঝড়, তীব্র নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস আর সর্বগ্রাসী লবণাক্ততা—এই পাঁচ দানবের সাথে লড়াই করতে করতে পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের। জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক পাপের কোনো দায় না নিয়েও এর চরম ও নিষ্ঠুরতম মূল্য চুকাতে হচ্ছে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার সুন্দরবন সংলগ্ন অঞ্চলের লাখো বাসিন্দাকে।
‎বিশেষ করে খুলনার পাইকগাছা, কয়রা  উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের জনজীবন আজ কোনো সাধারণ সংকটে নেই; তা রূপ নিয়েছে এক গভীর ও ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে। সিডর, আইলা, আম্পান, সিত্রাং, মোখা আর রেমালের মতো একের পর এক প্রলয়ঙ্করী দুর্যোগ এই জনপদকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে পঙ্গু করে দিয়েছে।
‎এই বহুমুখী সংকটের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নারী ও শিশুরা। আপাতদৃষ্টিতে একে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মনে হলেও, যুগের পর যুগ ধরে চলা উপকূলীয় অবহেলা ও টেকসই পরিকল্পনার অভাব একে একটি নীরব ও প্রাতিষ্ঠানিক ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনে’ রূপ দিয়েছে।
‎লোনা পানির নরককুণ্ড ও বিপন্ন নারীত্ব
‎উপকূলের মাইলের পর মাইল চষা কৃষি জমি আজ ধু-ধু মরুভূমি। জমিতে লোনা পানির আগ্রাসনে ধান চাষ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মহীন হয়ে পড়েছে হাজার হাজার পরিবার। জীবন সংগ্রামের নিষ্ঠুর তাগিদে আজ পুরুষদের পাশাপাশি নারীদেরও দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হচ্ছে স্রেফ দুমুঠো ভাতের জন্য। কিন্তু এই বেঁচে থাকার লড়াইয়ের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে শিশুদের ভবিষ্যৎ আর নারীদের ন্যূনতম স্বাস্থ্যসুরক্ষা। প্রতি বছর পাইকগাছা -কয়রা উপজেলার ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ ভেঙে তলিয়ে যায় গ্রামের পর গ্রাম। ক্ষতি হয় কাঁচা ঘরবাড়ি,ফসল ও মৎস্য সম্পদের। বর্ষা মৌসুমে বেশি আতংক থাকে উপকূলবাসী।
‎পাইকগাছের সোলাদানা ইউনিয়নের ফাতেমা বেগমের কণ্ঠে ঝরে পড়ল যুগের পর যুগ ধরে জমে থাকা ক্ষোভ আর বুকফাটা আকুতি,”এই লোনা পানির মধ্যে থাইকে আমাগো শরীরের চামড়ায় ঘা হয়ে গেছে। ঘরের মা-বোনদের নানা রোগব্যাধি লেগে থাকে। আমাগো ভিক্ষার ত্রাণ চাই না, আমাগো একটু শান্তিতে বাঁচার মতো টেকসই বেড়িবাঁধ আর একটু সুপেয় পানি চাই। আমাদের এভাবে মেরে ফেলা হচ্ছে কেন?”
‎তীব্র লবণাক্ততার কারণে এই অঞ্চলের নারীদের জরায়ুর রোগসহ নানা জটিল ও মরণব্যাধি জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। জরায়ু কেটে ফেলে জীবন বাঁচানোর মতো নির্মম ঘটনাও ঘটছে অহরহ। অন্যদিকে সুপেয় পানির সংকট এখানে কতটা তীব্র, তা কয়রা দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের মারুফা খাতুনের প্রতিদিনের রুটিন না দেখলে বিশ্বাস করা অসম্ভব। মাত্র এক কলস মিষ্টি পানির জন্য এই তীব্র তাপদাহের মধ্যে নারীদের মাইলের পর মাইল পথ হাঁটতে হচ্ছে।
‎অতিরিক্ত গরম আর দূষিত লোনা পানির কারণে শিশুরা প্রতিনিয়ত ভুগছে ডায়রিয়া ও তীব্র পুষ্টিহীনতায়। স্থানীয় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদী লবণাক্ততার প্রভাবে এই অঞ্চলের মানুষের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা লোপ পাচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এক পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
‎ত্রাণের ‘টোপ’ নয়, চাই স্থায়ী সমাধান
‎উপকূলীয় এলাকার মানুষ এখন আর এনজিও বা প্রশাসনের দেওয়া সাময়িক কোনো চাল-ডাল বা অনুদানের সান্ত্বনা পুরস্কার চায় না। তারা সাহায্যপ্রার্থী বা যাযাবর হয়ে বাঁচতে রাজি নয়। তাদের এখন প্রধান এবং একমাত্র দাবি—কপোতাক্ষ, শাকবাড়িয়া ও শিবসা নদীর তীব্র ভাঙন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ, সুপেয় পানির স্থায়ী সমাধান এবং বৈজ্ঞানিক উপায়ে নির্মিত টেকসই বেড়িবাঁধ।
‎স্থানীয় ভুক্তভোগী ও সামাজিক আন্দোলনের প্রতিনিধিরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে মানুষদের রক্ষা করতে এখনই রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। বছরের পর বছর শুধু আশ্বাস দেওয়া হয়, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। আর কতদিন এই মানুষগুলো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকবে?
‎সচেতন মহলের স্পষ্ট হুঁশিয়ারি—উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য যদি দ্রুত টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, সুপেয় পানির স্থায়ী ব্যবস্থা এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা না হয়, তবে এই মানবিক বিপর্যয় আগামীতে আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। একে আর হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
‎বছরের পর বছর ধরে প্রজেক্ট আসে, নামমাত্র বাঁধ সংস্কার হয়, আর সেই বাঁধ প্রথম জোয়ারের ধাক্কাতেই ধুয়ে যায়। উপকূলের মানুষ আর কতকাল এই ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনা ও জবাবদিহিতাহীন ব্যবস্থার শিকার হবে? দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই বিপন্ন জনপদকে মানচিত্র থেকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে হলে আর কোনো আমলাতান্ত্রিক ঢিলেমি বা বিচ্ছিন্ন ‘আইওয়াশ’ প্রজেক্ট চলবে না।
‎এখন প্রয়োজন যুদ্ধকালীন তৎপরতায় একটি দীর্ঘমেয়াদি, বৈজ্ঞানিক ও সমন্বিত মহাপরিকল্পনা। রাষ্ট্রকে অতি দ্রুত টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সুপেয় পানির অধিকার নিশ্চিত করে এই অঞ্চলের মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক দাবি পূরণ করতে হবে। অন্যথায়, এই অঞ্চলের লাখো মানুষের ভিটেমাটিহীন ও জলবায়ু উদ্বাস্তু হওয়ার দায় কোনোভাবেই এড়ানো যাবে না।
‎উপকূলের মানুষের চোখ এখন নীতি নির্ধারকদের দিকে। তারা দয়া বা অনুকম্পা চায় না; গ্লোবাল ক্লাইমেট ফান্ডের অধিকার এবং রাষ্ট্রের কাছে স্রেফ বেঁচে থাকার সাংবিধানিক গ্যারান্টি চায়।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

আরো খবর দেখুন
© All rights reserved © 2018
Design By BDit.com.bd