রেলের অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে জ্বালানির ব্যবহার। যদিও সংস্থাটির ট্রেনের সংখ্যা কমেছে। এখনো রেলওয়ে কভিড-পরবর্তী সময়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া ৯৯টি ট্রেন চালু করতে পারেনি। তার মধ্যে পূর্বাঞ্চলে ৫০ ও পশ্চিমাঞ্চলে ৪৯টি ট্রেন রয়েছে। ওসব ট্রেন দেশের বিভিন্ন রুটে উভয়মুখী যাত্রীসেবা দিতো। একই সংকটে পূর্বাঞ্চলে ওয়ার্কিং টাইমটেবিলে থাকা প্রতিদিন ১৪ থেকে ২৪টি ট্রেনও বন্ধ থাকছে। এমনকি বর্তমানে আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রা বাতিলও নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। আর গত কয়েক বছরে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। এতো ট্রেন ও সার্ভিস বন্ধ থাকার পরও প্রত্যাশিত হারে কমেনি রেলের জ্বালানি ব্যবহার। বরং বিভিন্ন সময়ে ট্রেন চলাচল বৃদ্ধির তুলনায় জ্বালানি ব্যবহার কয়েক গুণ বেড়েছে। মূলত জ্বালানি চুরির কারণেই রেলে জ্বালানির ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা কমানো যাচ্ছে না। বাংলাদেশ রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বাংলাদেশ রেলওয়ে বিগত কয়েক বছর ধরেই জনবল, লোকোমোটিভ, কোচসহ রোলিং স্টকের তীব্র সংকটে নাজুক অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু তারপরও জ্বালানি তেলের ব্যবহার বাড়ছে। মূলত ট্রেনে জ্বালানি চুরির ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটছে। বিশেষ করে পণ্যবাহী ট্রেন, বেশি স্টপেজ বা দীর্ঘ যাত্রাবিরতিতে থাকা ট্রেন এবং অনাকাঙ্ক্ষিত কারণে পথে অপেক্ষমাণ ট্রেন থেকেই বেশি ঘটছে তেল চুরি ঘটনা। যদিও গত কয়েক বছরে লোকোমোটিভে ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম বসানো হয়েছে। কিন্তু তাতেও চুরির প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং চলন্ত ট্রেনের পাশাপাশি ডিপো, স্টেশন ও সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যান্য পর্যায়ে জ্বালানির অপব্যবহার ও চুরি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে রেলের জ্বালানি তেলের চুরি ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে কঠিন হবে জ্বালানি ব্যবহারের ঊর্ধ্বমুখী ধারা নিয়ন্ত্রণ করা।
সূত্র জানায়, রেলের বিগত ২০২২-২৩ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জ্বালানির ব্যবহার সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। যদিও রেলওয়ে চলন্ত ট্রেন থেকে তেল চুরি ঠেকাতে লোকোমোটিভে জিপিএস ট্র্যাকিং ডিভাইস বসানোর কাজ শুরু করে। বর্তমানে রেলের প্রায় সব লোকোমোটিভেই দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে ওই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে করোনাকালে লকডাউনের কারণে দীর্ঘ সময় ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় তখন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছিল রেলে জ্বালানি ব্যবহার। কিন্তু বিগত ২০২২ সাল থেকে তা আবার অস্বাভাবিক হারে বাড়তে শুরু করে। বিগত ২০২১-২২ অর্থবছরে সীমিত পরিমাণ কয়লা বাদে রেলের মোট জ্বালানি ব্যবহার ছিল ২৪ হাজার ৫৮৫ টন। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে ৪৯ হাজার ৯৬৬ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আরো বেড়ে দাঁড়ায় ৫৫ হাজার ১৩২ টন।
সূত্র আরো জানায়, বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রেনগুলো বিগত ২০২১-২২ অর্থবছরে মোট ২ কোটি ১০ লাখ ৯৫ হাজার কিলোমিটার চলাচল করে। আর ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা ২৬ দশমিক ১১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ২ কোটি ৬৬ লাখ ৩ হাজার কিলোমিটার। কিন্তু একই সময়ে জ্বালানি ব্যবহার ১০৩ দশমিক ২৪ শতাংশ বেড়ে ২৪ হাজার ৫৮৫ থেকে ৪৯ হাজার ৯৬৬ টনে পৌঁছায়। আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ট্রেনের চলাচল দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ কমে ২ কোটি ৬৫ লাখ ৮১ হাজার কিলোমিটারে নেমে এলেও জ্বালানি ব্যবহার ১০ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেড়ে ৫৫ হাজার ১৩২ টনে দাঁড়ায়। ফলে এক বছরেই ট্রেনের মোট চলাচল সামান্য কমলেও অতিরিক্ত জ্বালানি তেলের ব্যবহার বেড়েছে ৫ হাজার ১৬৬ টন। সামপ্রতিক সময়েও সামন্ েএসেছে রেলের বিভিন্ন ট্রেনে তেল চুরির ঘটনা। বিগত ২০২৫ সালের আগস্টে আখাউড়া জংশনে একটি পণ্যবাহী ট্রেন থামিয়ে তেল চুরির ঘটনায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ মোট ৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে। তাছাড়াও বিভিন্ন ট্রেনে তেল চুরির অভিযোগ পাওয়া গেলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
এদিকে একক ট্রেন হিসেবে পণ্যবাহী ট্রেনে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি ব্যবহার হয়। কারণ ওসব ট্রেন ধীরগতিতে চলার পাশাপাশি যাত্রীবাহী ট্রেনকে অগ্রাধিকার দিতে বিভিন্ন স্টেশনে প্রায়ই অপেক্ষা করতে হয় দীর্ঘ সময়। যদিও গত ৬ বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে পণ্যবাহী ট্রেনের চলাচল। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পণ্যবাহী ট্রেনের মোট চলাচল ছিল ১৬ দশমিক ১০ লাখ কিলোমিটার। ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা কমে ১৩ দশমিক ৩৬ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৩ দশমিক ৬৮ লাখ কিলোমিটারে দাঁড়ায়। তারপর ২০২১-২২ অর্থবছরে ১২ দশমিক ৯৫ লাখ, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১১ দশমিক ৯৬ লাখ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা ৮ দশমিক ৫২ লাখ কিলোমিটারে নেমে আসে। অর্থাৎ ৬ বছরে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল প্রায় ৪৭ শতাংশ কমেছে। ফলে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল কমে যাওয়ার পরও সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবহার বেড়ে যাওয়া বাড়ছে রেলওয়ের আয়-ব্যয়ের ওপর বাড়তি চাপ।
অন্যদিকে রেলের যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগ সংশ্লিষ্টদের মতে, রেলের জ্বালানি ব্যবহার বৃদ্ধির পেছনে লোকোমোটিভ সংকট ও শিডিউল বিপর্যয়ের পাশাপাশি ট্রেন দুর্ঘটনা এবং পথিমধ্যে বারবার ইঞ্জিন বিকল হওয়ার ঘটনাও দায়ী। কারণ নির্ধারিত সময়ে ট্রেন চলতে না পারলেও অনেক ক্ষেত্রে ইঞ্জিন চালু রাখতে হয়। গত কয়েক বছরে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বিঘ্ন বাড়ায় দীর্ঘ সময় ইঞ্জিন আইডলিংয়ে রাখতে হচ্ছে। অথচ ওই সময়েও ডিজেল খরচ হচ্ছে। ফলে ট্রেন চলাচল না বাড়লেও জ্বালানি ব্যয় বাড়ছে। তাছাড়া পুরনো লোকোমোটিভ ব্যবহার এবং যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও বিশ্রাম ছাড়াই সেগুলো দিয়ে নিয়মিত ট্রেন পরিচালনার কারণেও জ্বালানির অপচয় হচ্ছে। তবে জ্বালানি পর্যবেক্ষণে বিগত ২০২০ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশ রেলওয়ের বেশ কয়েকটি লোকোমোটিভে ২২টি জিপিএস ফুয়েল ট্র্যাকার বসানো হয়। পরে পর্যায়ক্রমে প্রায় সব লোকোমোটিভেই ওই ধরনের ট্র্যাকার বসানো হয়েছে। তবে ২০২৪ সাল পর্যন্ত জ্বালানি ব্যবহারের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় তেল চুরি ঠেকানোর ওই উদ্যোগ পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। তাছাড়া জ্বালানি চুরি শুধু চলন্ত ট্রেনেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং বিপণন কোম্পানির ডিপো থেকে জ্বালানি সংগ্রহ, রেলের ডিপোতে মজুদ এবং সেখান থেকে বিভিন্ন স্টেশন ও ওয়ার্কশপে সরবরাহের পথেও অপচয় ও চুরির ঘটনা ঘটে।
এ বিষয়ে রেলের যুগ্ম মহাপরিচালক (যান্ত্রিক) মুহাম্মদ কুদরত-ই-খুদা জানান, রেলের জ্বালানি ব্যবহার শুধু চলাচলকারী ট্রেনের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না; ট্রেন চলাচল বাড়লে জ্বালানি ব্যবহারও বাড়ে। বন্ধ থাকা ট্রেনগুলোর বেশির ভাগই দ্বিতীয় শ্রেণীর। বিপরীতে সামপ্রতিক সময়ে বিভিন্ন দীর্ঘ রুটে আন্তঃনগর ট্রেন চালু হয়েছে। ফলে ট্রেনের সংখ্যা কমলেও মোট ট্রেন চলাচল বাড়ায় জ্বালানি ব্যবহার বেড়ে থাকতে পারে।
এক প্রসঙ্গে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম জানান, রেলের জ্বালানি চুরির বিষয়টি সম্পর্কে কর্তৃপক্ষ অবগত। ওই ধরনের ঘটনা ঠেকাতে ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করা হয়েছে। যেসব পয়েন্টে তেল চুরির ঝুঁকি বেশি, সেগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। কোনো ব্যক্তি বা দপ্তরের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও এ বিষয়ে সর্বোচ্চ কঠোরতা বজায় থাকবে। তবে নতুন কোনো পদ্ধতি চালুর পর একটি সমস্যা শতভাগ দূর করতে কিছুটা সময় লাগে। রেলওয়ের জ্বালানি অপচয় ও চুরি বন্ধে সরকার কাজ করছে।