বিদেশ : ছেলের নাম উল্লেখ করতেই ওলেনার নীল চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। হিংস্র প্রাক্তন স্বামীর হাত থেকে নিরাপদ আশ্রয় পাওয়ার পর তার মুখে ফিরে এসেছে হারিয়ে যাওয়া সেই হাসি। খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র। ওলেনা ও তার ছোট ছেলে এখন ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের একটি আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাস করছে। রাশিয়া ২০২২ সালে ইউক্রেনে আগ্রাসন শুরুর পর থেকে পরিচয় গোপন রাখা এই অ্যাপার্টমেন্ট ভবনটি শুধু পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারীদেরই নয়, পূর্ব ইউক্রেনের যুদ্ধকবলিত এলাকা থেকে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে আসা মা ও শিশুদেরও আশ্রয় দিয়ে আসছে। ওলেনা অবশ্য তার আসল নাম নয়। যুদ্ধ শুরুর পর তিনি চাকরি হারিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি দেশে চলে গিয়েছিলেন। সেখানে এক ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি অন্তঃসত্ত্বা হন, বিয়ে করেন এবং পরে স্বামীর মারধরের শিকার হয়ে শরীরের আঘাতের দাগ লুকিয়ে রাখতে বাধ্য হন। এখন তিনি স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ করেছেন এবং সন্তানের একক অভিভাবকত্ব পাওয়ার চেষ্টা করছেন। এএফপিকে তিনি বলেন, যুদ্ধ চললেও তিনি সাবেক স্বামীর ওপর নির্ভরশীল থাকার চেয়ে ‘অনেক বেশি নিরাপদ’ বোধ করছেন। তিনি বলেন, ‘ইউক্রেনে এমন জায়গা আছে, যেখানে একজন নারী লুকিয়ে নিরাপদে থাকতে পারেন—এটা সত্যিই ভালো বিষয়।’ ইউক্রেনীয় পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে পরিচালিত এই আশ্রয়কেন্দ্রটি আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশনের সহায়তা পেয়ে আসছে। ২০২২ সাল থেকে এখানে ১৫০ জন নারী ও শিশু আশ্রয় নিয়েছে। কেন্দ্রটির দায়িত্বে থাকা নাতালিয়া লিয়েশুকোভা বলেন, তিনি ‘সব নারীকে সাহায্য করতে’ চান। তবে একসঙ্গে মাত্র ছয়জনকে এখানে রাখা সম্ভব। ফলে, আশ্রয়ের জন্য অপেক্ষমাণ মানুষের তালিকাও দীর্ঘ। আশ্রয়কেন্দ্রের কার্যালয়ের দেয়ালে বিভিন্ন সময়ে সেখানে আসা বিখ্যাত ব্যক্তি ও সহযোগীদের ছবি টাঙানো রয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম ব্রিটিশ সংগীতশিল্পী এলটন জন, যিনি ২০১৮ সালে কিয়েভ সফরে এসেছিলেন। যুদ্ধের কারণে বহু ইউক্রেনীয় মানুষ অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন। একই সঙ্গে দেশটির সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থার ওপর চাপ বেড়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই রুশ হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, রাশিয়ার আগ্রাসনের আগের বছর ২০২১ সালের তুলনায় ইউক্রেনে দারিদ্র্যের হার দ্বিগুণ হয়ে ৪১ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে। আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনাকারী ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক হালিনা স্কিপালস্কা বলেন, ‘সন্তান থাকা নারীরা আরও বেশি দরিদ্র হয়ে পড়েছেন, কারণ তাদের একসঙ্গে একাধিক সমস্যার মোকাবিলা করতে হচ্ছে।’ তিনি বলেন, এসব সমস্যার মধ্যে রয়েছে শুধু পারিবারিক সহিংসতা নয়—পরিচয়পত্র না থাকা, যুদ্ধের কারণে শিশুদের গুরুতর মানসিক সমস্যা, কথা বলার সমস্যা এবং অপুষ্টিও রয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রের অধিকাংশ মা তাদের বাড়িঘর হারিয়েছেন। অনেকের বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে, আবার কিছু বাড়ি এখন রয়েছে রুশ বাহিনীর দখলে থাকা এলাকায়। আশ্রয়কেন্দ্রের আরেক বাসিন্দা ক্রিস্টিনার নামও পরিবর্তন করা হয়েছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে তার একটি কন্যাসন্তান জন্ম নেওয়ার কথা। এ বছর তিনি যুদ্ধের সম্মুখসারির একটি এলাকা থেকে কিয়েভে এসে ক্যাশিয়ার হিসেবে চাকরি নেন। তিনি এএফপিকে বলেন, ‘সেখানে কাজ শুরু করার এক মাসের মধ্যেই আমি জানতে পারি যে আমি গর্ভবতী। আমি ওই লোককে পুরো ব্যাপারটা জানাই। লোকটি আমাকে চলে যেতে বলল।’ একক মা হিসেবে চাকরি করা সম্ভব হবে না—এমন আশঙ্কায় তাকে নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়ার কথা ভাবতে হয়। সেখানে ছিল ‘পরিত্যক্ত’ একটি বাড়ি, কোনো গরমের ব্যবস্থা নেই, চারদিকে রুশ গোলাবর্ষণের ভয়, আর ছিলেন তার মদ্যপ বাবা ও ভাই। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়েছিল, আমার জীবন শেষ।’ তবে কিয়েভেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তার বোনের সহায়তায় আশ্রয়কেন্দ্রে থাকার ব্যবস্থা হয়। তিনি বলেন, ‘এখানে আমি শান্তিতে ঘুমাতে পারি। আর আমার ছোট্ট মেয়েটিকে আমি ভালোবাসি। যুদ্ধের কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত শিশুদের জন্য কথা বলার চিকিৎসা বা স্পিচ থেরাপির চাহিদা বাড়তে থাকাও ফাউন্ডেশনটির জন্য বড় একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাঁচ বছরের দিয়ানা ও চার বছরের বোগদান ভাই-বোন। তারা যুদ্ধবিধ্বস্ত পূর্বাঞ্চলের বাখমুত শহর থেকে এসেছে। লিয়েশুকোভা জানান, ‘একটি দেয়াল মানুষের ওপর ধসে পড়তে দেখার পর তারা কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিল।’ ছয় মাস পর পরিবারটি আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ঠিক তখনই খবর আসে, তাদের সেনাসদস্য বাবা যুদ্ধে নিহত হয়েছেন।