শেখ সৈয়দ আলী, ফকিরহাট: ফকিরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান সহকারী (বড় বাবু) মোঃ শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতি ও অনিয়মের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ প্রকাশ্যে আসছে। ফাইল গায়েব, প্রসূতি কর্মচারীর মাতৃত্বকালীন ছুটির টাকা আত্মসাৎ, সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের জ্বালানি বিল জালিয়াতি, সরকারি সম্পদ চুরি এবং জমি দখলের অভিযোগে গোটা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রশাসনিক পরিবেশ ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে লিখিত অভিযোগে জানানো হয়েছে। এসব সুনির্দিষ্ট অনিয়মের প্রতিকার চেয়ে ভুক্তভোগী কর্মচারী ও সচেতন এলাকাবাসী দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক এবং বাগেরহাটের সিভিল সার্জনসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, শহিদুল ইসলাম ২০১১ সালে যোগদানকারী কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডারদের (সিএইচসিপি) গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক ফাইল কৌশলে গায়েব করে দেন। পাইকপাড়া সিএইচসিপি মোসাঃ মাহমুদা খাতুন, পাগলা শ্যামনগরের রুবিয়া খাতুন এবং বিঘায়ের ক্ষমা দাসের মূল ফাইল গায়েব হওয়ার বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জবাবদিহিতা চাইলে শহিদুল ইসলাম নানা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে তা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই ফাইল গায়েবের ঘটনা অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে এক নারী কর্মীর ওপর দীর্ঘ ৬ বছর ধরে চলা অমানবিক আর্থিক জালিয়াতির তথ্য। ২০১৮ সালে সিএইচসিপি মাহমুদা খাতুন প্রসবকালীন জটিলতায় এক মাসের অর্জিত ছুটি ভোগ করেন। কমিউনিটি বেসড হেলথ কেয়ার (সিবিএইচসি) থেকে স্ববেতনে ছুটির অনুমোদন এলেও শহিদুল ইসলাম তা গোপন করে মাহমুদা খাতুনকে জানান যে ছুটি ‘বিনা বেতনে’ পাস হয়েছে। এই অজুহাতে তিনি মাহমুদা খাতুনের জানুয়ারি মাসের সম্পূর্ণ ১০,২০০ টাকা নিজের পকেটে পুরেন বলে ভুক্তভোগী দাবি করেন। দীর্ঘ ৬ বছর পর গত নভেম্বর মাসে বিষয়টি প্রকাশ পেলে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার সামনেই শহিদুল নিজের ভুল স্বীকার করেন এবং ১,০০০ টাকা ফেরত দিয়ে বাকি টাকা পরে দেওয়ার আকুতি জানান। বর্তমানে ভুয়া চালানের কপি বানিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে বলেও লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে উঠেছে সরকারি জরুরি সেবা ব্যাহত করারও গুরুতর অভিযোগ। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রাক্তন অ্যাম্বুলেন্স চালক আতিক মুঠোফোনে বিস্ফোরক তথ্য দিয়ে জানান, শহিদুল তার গাড়ির সরকারি জ্বালানি বিলের ৪৫ হাজার টাকা জালিয়াতি করে নিজে তুলে নেন। কাগজে-কলমে চালককে ৩৫ হাজার টাকা দেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে চালক এক টাকাও পাননি। এছাড়া ওই চালকের কাছে ১ লক্ষ টাকা ঘুষ দাবি করে বলেছিলেন, এই টাকা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (টিএসও)-কে দিতে হবে। ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বিভ্রান্ত করে টানা দুই মাস নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে হাসপাতালের সরকারি অ্যাম্বুলেন্স সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়, যা সাধারণ রোগীদের চরম ভোগান্তিতে ফেলে। পরবর্তীতে শহিদুলের অনবরত হয়রানি ও মানসিক চাপে চালক আতিক ফকিরহাট থেকে অন্যত্র বদলি হতে বাধ্য হন।
হাসপাতালের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতাও ভেঙে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নিয়মে সকাল ৮:৩০ টায় কার্যালয়ে উপস্থিত থাকার বিধান থাকলেও শহিদুল ইসলাম অফিসে আসেন দুপুর ১২টায়। এর আগেও তার বিরুদ্ধে সরকারি কোয়ার্টারে দীর্ঘ ৮ বছর বিনামূল্যে অবস্থান করে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
দীর্ঘ ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে একই হাসপাতালে কর্মরত থাকার সুবাদে শহিদুল ইসলাম তৈরি করেছেন একক আধিপত্য। ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করে তিনি হাসপাতালের সম্পদ নিজের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী কাজী শাহেনশাহ মিঠুন জানান, শহিদুল প্রায় সময়ই তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে মানুষকে বিপদে ফেলেন এবং ক্ষমতার দাপটে তার নিজের জমিও দখল করে খাচ্ছেন।
হাসপাতালের কর্মচারীদের ওপর নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে ফকিরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মালি নাজমুল হক বলেন, শহীদুল ইসলাম বিভিন্ন সময়ে কর্মচারীদের ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালান। এমনকি ইচ্ছাকৃতভাবে তার কোয়ার্টারের পানি ৩ দিন বন্ধ করে রাখা হয়েছিল, যার ফলে তিনি চরম পানির কষ্টে ছিলেন। এছাড়া বাউন্ডারি নির্মাণের রড ও ইট নিজের জমিতে রেখে বিক্রি করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ করে তিনি এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি জানান।
এলাকাবাসীর পক্ষে নাজির উদ্দিন বলেন, দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে একই হাসপাতালে কর্মরত থাকার সুযোগে শহিদুল জাঁকিয়ে বসেছেন। হাসপাতালের পুকুরের মাটি, ভবনের ইট ও রড সবকিছু হাসপাতালের পাশে তার একটি নিজস্ব জমিতে এনে রাখতেন। হাসপাতালের ভেতরের কোনো গাছের ডাল একটু শুকিয়ে গেলেই ফজরের আজানের আগে এসে কেটে বাসায় নিয়ে যেতেন।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মিন্টু শেখ বলেন, শহিদুল ইসলাম তার প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে হাসপাতালের পুকুরের মাটি ও ইট এনে নিজের জমিতে রেখেছেন এবং জোর করে একজনের জমি দখল করে রেখেছেন। এই বিতর্কিত কর্মকর্তা ফকিরহাটে না থাকলেই এলাকার মানুষের জন্য মঙ্গল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
উত্থাপিত এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রধান সহকারী (বড় বাবু) মোঃ শহিদুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে চাই না।”
অন্যদিকে, ফকিরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান সাগরের সাথে একাধিকবার সাংবাদিকরা যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনিও কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
তবে বাগেরহাট জেলা সিভিল সার্জন ডাঃ আ. স. মাহবুবুল আলম জানান, “বিষয়টি নিয়ে কয়েকটি অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত কমিটি গঠন করে ঘটনার সত্যতা প্রমাণ হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
একজন প্রধান সহকারীর বিরুদ্ধে জরুরি অ্যাম্বুলেন্স সেবা বন্ধ রাখা, প্রসূতি মায়ের অর্জিত অর্থ আত্মসাৎ এবং সরকারি সম্পদ নয়ছয়ের অভিযোগে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রভাবমুক্ত বিচারের স্বার্থে অভিযুক্ত মোঃ শহিদুল ইসলামকে অবিলম্বে সাময়িক বরখাস্তের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসী।