আগামী বছরের ৬ জুনের আগেই দেশের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন শেষ করতে হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। তবে ভোট শুরুর চূড়ান্ত তারিখ এখনো ঠিক হয়নি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের দেওয়া তথ্য, পরীক্ষার সময়সূচি এবং অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে কয়েক দফা আলোচনা শেষে ভোটের তারিখ চূড়ান্ত করা হবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) নির্বাচন ভবনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আন্তঃমন্ত্রণালয় প্রস্তুতিমূলক সভা হয়। সভা শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান ইসি সানাউল্লাহ।
তিনি বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে আরও আলোচনা হবে। কবে থেকে ভোট শুরু হবে, সেই চূড়ান্ত তারিখ আরও বৈঠকের পর জানানো হবে। এ জন্য কিছু সাইডলাইন ওয়ার্কও করতে হবে। সভায় অংশ নেওয়া সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই আগামী বছরের ৬ জুনের আগে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শেষ করার বিষয়ে একমত হয়েছে।
পরীক্ষার কারণে বদলাতে পারে সময়সূচি
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছিল, দেশের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সাত ধাপে আয়োজনের প্রাথমিক পরিকল্পনা রয়েছে। সেই পরিকল্পনায় প্রথম ধাপের ভোট ১২ নভেম্বর আয়োজনের কথা ছিল। তবে বিভিন্ন পরীক্ষার কারণে আগের সম্ভাব্য সময়সূচিতে পরিবর্তন আসতে পারে।
ইসি সানাউল্লাহ বলেন, নভেম্বর ও ডিসেম্বরে পরীক্ষা রয়েছে। জানুয়ারিতে কিছুটা সময় পাওয়া যেতে পারে, তবে তখন রোজা থাকবে। তাই পরীক্ষা যাতে কোনোভাবে ব্যাহত না হয়, সেটি বিবেচনায় নিয়েই নির্বাচনের সময় ঠিক করতে হবে। প্রয়োজন হলে ভোটের ধাপও কমানো হতে পারে।
তিনি জানান, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার প্রতিনিধিরা ভোটের সময় নিয়ে নিজেদের মতামত দিয়েছেন। এসব তথ্য কমিশন সভায় পর্যালোচনা করার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। যত দ্রুত সম্ভব ভোটের নির্দিষ্ট তারিখ জানানো হবে।
সাত ধাপে ভোটের প্রাথমিক পরিকল্পনা
ইউপি নির্বাচন সাত ধাপে আয়োজনের যে প্রাথমিক পরিকল্পনা করা হয়েছে, তাতে প্রথম ধাপে ৮০টি উপজেলার ভোট ১২ নভেম্বর করার কথা রয়েছে। এরপর দ্বিতীয় ধাপের ভোট ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপ ৩০ ডিসেম্বর, চতুর্থ ধাপ আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি, পঞ্চম ধাপ ৪ ফেব্রুয়ারি, ষষ্ঠ ধাপ ২২ এপ্রিল এবং সপ্তম ও শেষ ধাপ ২৭ মে আয়োজনের প্রাথমিক পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে এই তারিখগুলো চূড়ান্ত নয়। প্রস্তুতিমূলক সভা থেকে পাওয়া তথ্য ও সংশ্লিষ্টদের মতামত পর্যালোচনা করে সময়সূচিতে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন আনা হতে পারে।
ইসি সানাউল্লাহ বলেন, আগে যে তারিখগুলো জানানো হয়েছিল, সেগুলো ছিল সম্ভাব্য সময়। নভেম্বর থেকে নির্বাচন শুরু হবে কি না, সেটিও এখনো চূড়ান্ত হয়নি। কমিশন সভায় বিষয়টি আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনও বিবেচনায়
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনের কারণে জেলার স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রথম ধাপে রাখা হয়নি। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঠাকুরগাঁওকে পরবর্তী কোনো ধাপে নেওয়া হবে।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে সংসদ নির্বাচনের মতো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের বিষয়েও প্রস্তুতিমূলক সভায় আলোচনা হয়েছে।
এদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবে নির্বাচন কমিশন। আগামী ২৩, ২৪ ও ২৫ সেপ্টেম্বর দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের পরিকল্পনা রয়েছে। ঠাকুরগাঁও বাদে দেশের ৬৩ জেলায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে কমিশনের।
২৬ মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক
বৃহস্পতিবারের প্রস্তুতিমূলক সভায় ২৬টি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এর মধ্যে ছিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
এ ছাড়া তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগ এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের প্রতিনিধিরাও বৈঠকে ছিলেন।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, কোস্টগার্ড, আনসার ও ভিডিপি, ডিজিএফআই, এনএসআই ও এনটিএমসির প্রতিনিধিদের পাশাপাশি বাংলাদেশ ডাক বিভাগ, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধিরাও সভায় অংশ নেন। ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর পরিচালক বা উপযুক্ত কর্মকর্তাকে পাঠানোর জন্যও অনুরোধ জানানো হয়েছিল।
প্রশাসনিক ও আইনি প্রস্তুতিও চলছে
স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে প্রশাসনিক ও আইনি প্রস্তুতি শুরু করেছে। সীমানা ও আইনসংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়েও কাজ চলছে।
ইসি সানাউল্লাহ বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুরো ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শেষ করতে হলে এখন থেকেই পরবর্তী কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। বিভিন্ন দিক সমন্বয় করে কমিশন পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।
এর আগে চলতি মাসে তফসিল দিয়ে নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরুর পরিকল্পনা জানিয়েছিল কমিশন। সাত ধাপে ভোট আয়োজনের সম্ভাব্য তারিখও প্রকাশ করা হয়েছিল। তবে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় পাওয়া নতুন তথ্য ও বিভিন্ন পক্ষের মতামত বিবেচনা করে সেই পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে।
ফলে আপাতত নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা হিসেবে আগামী বছরের ৬ জুনের আগেই ইউনিয়ন পরিষদ ভোট শেষ করার বিষয়টি সামনে রয়েছে। ভোট শুরুর নির্দিষ্ট তারিখ ও ধাপের সংখ্যা কমিশনের পরবর্তী বৈঠকেই চূড়ান্ত হবে।