বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত চত্বর নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ার। সেখানে হঠাৎ করেই দেখা গেল এক অদ্ভুত দৃশ্য; কয়েক শ মানুষ সারি বেঁধে মাটিতে বসে পড়েছেন। তারপর শুরু হলো সমবেতভাবে বৈঠা চালানোর ভঙ্গি! কেউ সামনে ঝুঁকছেন, কেউ পেছনে হেলছেন। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, কোনো অদৃশ্য নৌকা বেয়ে চলেছেন তাঁরা। এটি কোনো প্রতিবাদ কর্মসূচি বা ফ্ল্যাশমব নয়; এটি ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত সমর্থক-উদযাপন ‘ভাইকিং রো’।
দীর্ঘ ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরেছে নরওয়ে। আর দলের এই ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনকে উদযাপনে রূপ দিতে নরওয়েজিয়ান সমর্থকেরা বেছে নিয়েছেন এই অভিনব পন্থা। মাঠের গ্যালারি থেকে শুরু করে নিউইয়র্কের সাবওয়ে, এসকেলেটর, শহরের ব্যস্ত রাস্তা সবখানেই এখন এই উদযাপনের ঢেউ। এমনকি এর ছোঁয়া পৌঁছে গেছে খোদ নরওয়ের জাতীয় সংসদেও! এক পর্যায়ে সংসদের কার্যক্রমে বিরতি দিয়ে কয়েকজন আইনপ্রণেতা একসঙ্গে ‘ভাইকিং রো’ করে দলের প্রতি সমর্থন জানান।
অনেকেই একে ২০১৬ ইউরো কাপে আইসল্যান্ডের কাঁপানো বিখ্যাত ‘ভাইকিং ক্ল্যাপ’-এর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন। তবে দুটির মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। আইসল্যান্ডের সমর্থকেরা ধীরগতির তালি ও গর্জনের সমন্বয়ে ‘ভাইকিং ক্ল্যাপ’ করেছিলেন। অন্যদিকে, ‘ভাইকিং রো’ হলো পুরোপুরি বৈঠা চালানোর ভঙ্গিতে করা একটি সমবেত শারীরিক উদযাপন।
এই ‘ভাইকিং রো’-এর পেছনে রয়েছে উত্তর ইউরোপের হাজার বছরের প্রাচীন ইতিহাস। অষ্টম থেকে একাদশ শতক পর্যন্ত স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চলের নাবিক ও লড়াকু যোদ্ধারা ‘ভাইকিং’ নামে পরিচিত ছিলেন। বর্তমান নরওয়ে, সুইডেন ও ডেনমার্কের এই মানুষেরা সমুদ্রযাত্রা ও দূরসাহসী অভিযানের জন্য বিখ্যাত ছিলেন।
তাদের ব্যবহৃত দীর্ঘাকৃতির জাহাজ বা ‘লংশিপ’ ছিল সেই যুগের অন্যতম প্রতীক। এই লংশিপগুলো চলত মূলত মানুষের বাহুবলে। কখনো ৩০, কখনোবা ৫০ জন নাবিক একসঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রাচীন সেই নৌকার বৈঠা চালাতেন। আধুনিক সময়ে নরওয়েজিয়ান ফুটবল সমর্থকেরা তাদের সেই গৌরবময় জাতীয় ঐতিহ্য ও লড়াকু মানসিকতাকে ফুটবল মাঠে পুনর্জীবিত করেছেন এই ‘ভাইকিং রো’-এর মাধ্যমে।
মাঠে আর্লিং হালান্ডের অতিমানবীয় ফর্ম, আর গ্যালারিতে নরওয়েজিয়ানদের এই ‘ভাইকিং রো’; সব মিলিয়ে ব্রাজিলের নান্দনিক সাম্বা ফুটবলের বিরুদ্ধে এক কঠিন লড়াইয়ের মঞ্চ প্রস্তুত। এখন দেখার বিষয়, মাঠের এই ফুটবল মহাকাব্যে শেষ হাসি কারা হাসে; সাম্বার জাদুকরেরা নাকি আধুনিক যুগের এই ভাইকিংরা!







