মোঃনাজমুল মোরেলগঞ্জ (বাগেরহাট) প্রতিনিধি: মা ইলিশ সংরক্ষণে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে ইলিশ আহরণে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার জেলেরা। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) মধ্যরাত থেকে নদী ও সাগরে মাছ ধরতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাঁরা। এদিকে, ইলিশ আহরণের জন্য উপজেলার ৩৩টি আর্টিসানাল নৌযানকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে উপজেলা মৎস্য কার্যালয়।
উপজেলার বিভিন্ন জেলে গ্রামে এখন জাল মেরামত, ট্রলার প্রস্তুত এবং মাছ ধরার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলেরা। তাঁদের আশা, নিষেধাজ্ঞা শেষে পর্যাপ্ত ইলিশ ধরা পড়লে দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট কিছুটা কমবে। তবে মাছ না পেলে ঋণের বোঝা আরও বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার জেলে পরিবারের বসবাস। বংশপরম্পরায় মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা এসব জেলের অনেকেই ট্রলার ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের খরচ মেটাতে মৎস্য আড়তদারদের কাছ থেকে দাদন নিয়ে সাগরে যান। অভিযোগ রয়েছে, ট্রলারপ্রতি কয়েক লাখ টাকা অগ্রিম নেওয়ার পর মাছ বিক্রির অর্থ থেকে ঋণ ও কমিশন পরিশোধ করতে হয় তাঁদের। মাছ কম ধরা পড়লে ঋণ পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে জেলের মৃত্যুর পরও তাঁর পরিবারের সদস্যদের সেই ঋণের বোঝা বহন করতে হয়।
গাবতলা গ্রামের জেলে গিয়াস তালুকদার, আব্দুল গফ্ফার তালুকদার, ওহিদুল শেখ, রুহুল আমিন আকন ও রুবেল তালুকদার জানান, তাঁদের গ্রামে প্রায় ২০০ পরিবার মাছ ধরার পেশায় যুক্ত। তাঁদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞাকালে সরকারি খাদ্যসহায়তার আওতায় প্রকৃত অনেক জেলে পরিবার বাদ পড়েছে। অন্যদিকে, পেশার সঙ্গে যুক্ত নন—এমন কেউ কেউ সহায়তা পেয়েছেন বলেও দাবি তাঁদের। এ কারণে জেলেদের তালিকা যাচাই করে প্রকৃত জেলেদের সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। পাশাপাশি বিনা সুদে ঋণ এবং খাদ্যসহায়তার পরিমাণ বাড়ানোরও দাবি জানান।
উপজেলা মৎস্য কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মোরেলগঞ্জে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় সাত হাজার। এর মধ্যে মা ইলিশ সংরক্ষণ কর্মসূচির আওতায় ২ হাজার ১২৭টি জেলে পরিবারকে ২৫ কেজি করে মোট ৫৩ দশমিক ১৭৫ মেট্রিক টন ভিজিএফের চাল দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্যমতে, মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান চলাকালে ২৬টি অভিযান ও একটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। এ সময় প্রায় ৫০ হাজার মিটার অবৈধ জাল জব্দ করে বিনষ্ট করা হয় এবং দুজনকে মোট ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা রনজিৎ কুমার বলেন, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অবৈধ জাল জব্দ ও বিনষ্টের পাশাপাশি নির্ধারিত জেলে পরিবারগুলোর মধ্যে সরকারি খাদ্যসহায়তা বিতরণ করা হয়েছে। জেলেদের জীবনমান উন্নয়নে পরিবারগুলোকে রেশন ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হাবিবুল্লাহ বলেন, জেলেদের বিনা সুদে ঋণের ব্যবস্থা করার বিষয়টি উপজেলা মাসিক সমন্বয় সভায় প্রস্তাব আকারে তুলে ধরে রেজুলেশন করা হবে। পাশাপাশি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নিষেধাজ্ঞা শেষে ইলিশ আহরণ শুরু হলেও জেলেদের আর্থিক সংকট কাটাতে সহজ শর্তে ঋণ, প্রকৃত জেলে শনাক্তকরণ এবং সরকারি সহায়তার সুষ্ঠু বণ্টন জরুরি। একই সঙ্গে মৎস্য আইন মেনে অনুমোদিত নৌযানে মাছ ধরা, অবৈধ জাল ব্যবহার থেকে বিরত থাকা এবং ইলিশের প্রজনন ও সংরক্ষণে সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।