1. admin@dakshinanchal24.com : admin@dakshinanchal24.com :
বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৫৮ অপরাহ্ন

ভয়ভীতি দেখিয়ে পদত্যাগ, দুই বছরেও স্বপদে ফিরতে পারেননি অধ্যক্ষ অদ্রীস

Reporter Name
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
🖼️ ফটো কার্ড তৈরি করুন
তারিক লিটু, কয়রা (খুলনা)
১৫ আগস্ট ২০২৪। খুলনার কয়রা উপজেলার কপোতাক্ষ কলেজের অধ্যক্ষ অদ্রীস আদিত্য মণ্ডলের জন্য দিনটি যেন জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক দিন। সেদিন কলেজে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে আন্দোলনকারীদের একটি দল তাঁর পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করে। তাঁকে না পেয়ে দলটি যায় তাঁর বাড়ির দিকে। পরে স্থানীয় একটি বাড়িতে তাঁকে খুঁজে পাওয়ার পর সেখানে তাঁকে ঘিরে ধরে পদত্যাগের জন্য চাপ দেওয়া হয়।
অদ্রীস আদিত্যের ভাষ্য, শুধু তাঁকেই নয়, তাঁর পরিবারকেও ভয়ভীতি দেখানো হয়েছিল। একপর্যায়ে জীবননাশের হুমকি ও শারীরিকভাবে হেনস্তার মুখে তাঁকে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়। পরে উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ ও নৌবাহিনীর সদস্যরা তাঁকে উদ্ধার করেন।
সেই ঘটনার পর কেটে গেছে দুই বছর। কিন্তু অদ্রীস আদিত্যের জীবন যেন আটকে আছে সেই ১৫ আগস্টেই। কলেজের অধ্যক্ষের পদ থেকে সরে যাওয়ার পর তিনি আর স্বপদে ফিরতে পারেননি। বর্তমানে কয়রায় না থেকে খুলনায় অবস্থান করছেন। নিজের পদ ফিরে পেতে খুলনা ও ঢাকার বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরছেন, করছেন আবেদন-নিবেদন। তাঁর ভাষায়, ‘চাকরি ফিরে পাওয়ার লড়াইটা এখন আমার জীবনের সবচেয়ে বড় লড়াই।’
অদ্রীসের দাবি, পরবর্তী সময়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, খুলনা থেকে তাঁকে তিন দফা কলেজে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু স্থানীয় কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষের বাধার কারণে তিনি যোগ দিতে পারেননি। শুধু তাই নয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর থেকে বিধি অনুযায়ী বিষয়টি আইনগতভাবে নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁর বেতন-ভাতা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও সেটিও কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ তাঁর।
অদ্রীস আদিত্য বলেন, ২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে একদল লোক কলেজে ঢুকে তাঁর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে পদত্যাগ দাবি করে। তিনি তখন কলেজে ছিলেন না। দীর্ঘ সময় তাঁকে না পেয়ে আন্দোলনকারীরা তাঁর বাড়ির দিকে যায়। তাঁর অভিযোগ, বাড়িতে তাঁকে না পেয়ে তাঁর সন্তান ও কাকাকে হুমকি দেওয়া হয়। পরে আশপাশের কয়েকটি বাড়িতে তাঁকে খোঁজা হয়। একপর্যায়ে স্থানীয় আজিজুল ইসলামের বাড়িতে তাঁকে পাওয়া যায়।
অদ্রীসের ভাষায়, সেখানে তাঁকে পদত্যাগ করতে বলা হয়। তিনি রাজি না হওয়ায় তাঁকে গালিগালাজ, শারীরিক হেনস্তা ও জীবননাশের হুমকি দেওয়া হয়। একপর্যায়ে লিখিত পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন তিনি। অদ্রীস বলেন, ‘আমি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করিনি। নিজের জীবন ও পরিবারের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে পরিস্থিতির চাপে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়েছিলাম।’
তাঁর দাবি, প্রশাসনের লোকজন তাঁকে উদ্ধারের পরও মাঝপথে আবার কলেজে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁকে নিজ হাতে পদত্যাগপত্র লেখার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল। তিনি নিজ হাতে লিখতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে বলা হয়, ওই পরিস্থিতিতে আন্দোলনকারীদের কাছ থেকে তাঁকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। পরে পারিবারিক কারণ দেখিয়ে লেখা পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করেন তিনি।
সেদিনের ঘটনার সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নাম ব্যবহারের বিষয়টিও সামনে এসেছে। কয়রা উপজেলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল গালিব বলেন, ওই সময় কপোতাক্ষ কলেজের অধ্যক্ষের পদত্যাগের ক্ষেত্রে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানার ব্যবহার না করলেও কযেকজন বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতা উপস্থিত ছিল বলে তিনি শুনেছেন। তাঁর দাবি, স্থানীয় একটি পক্ষ ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলের জন্য কিছু শিক্ষার্থীকে সামনে রেখে মব সংগঠিত করে ওই কর্মসূচি করেছিল। সেটি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাংগঠনিক কর্মসূচি ছিল না।
অধ্যক্ষের পদ হারানোর পর অদ্রীস আদিত্যের জীবনযাপনেও এসেছে বড় পরিবর্তন। কয়রার কর্মস্থল ছেড়ে তিনি এখন খুলনায় অবস্থান করছেন। সেখান থেকেই বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে চাকরি ফিরে পেতে আবেদন করছেন। এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে আবেদন, কাগজপত্র নিয়ে ছুটে চলা, আবার নতুন করে সিদ্ধান্তের অপেক্ষা—এভাবেই কেটে যাচ্ছে তাঁর দিন।
অদ্রীসের দাবি, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে তাঁকে তিনবার যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কলেজে যোগ দিতে গিয়ে স্থানীয় বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, যদি তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে থাকেন, তাহলে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর কেন বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য উদ্যোগ নিয়েছে? আর যদি তাঁর পদত্যাগ আইনগতভাবে বৈধই হয়ে থাকে, তাহলে এত দপ্তরে আবেদন করার পরও বিষয়টির সুস্পষ্ট নিষ্পত্তি কেন হচ্ছে না?
অদ্রীসের অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁর বেতন-ভাতা। তিনি জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর থেকে বিধি অনুযায়ী এবং বিষয়টি আইনগতভাবে নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁর বেতন-ভাতা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমনকি আঞ্চলিক পরিচালক কলেজ কর্তৃপক্ষকে মুঠোফোনে বেতন-ভাতা ছাড় করার নির্দেশ দিয়েছেন বলেও দাবি তাঁর। কিন্তু এরপরও বেতন-ভাতা পাননি বলে অভিযোগ করেন তিনি। অদ্রীস বলেন, ‘আমি কোনো অন্যায় সুবিধা চাই না। বিধি অনুযায়ী আমার বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত হওয়ার, সেটি হোক। আমি শুধু ন্যায্যভাবে আমার কর্মস্থলে ফিরে যেতে চাই এবং যে সময়ের বেতন-ভাতা পাওয়ার কথা, সেটি পেতে চাই।’
অদ্রীস আদিত্য সরে যাওয়ার পর কপোতাক্ষ কলেজে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মাওলানা অলি উল্লাহ। তাঁর বক্তব্য, ২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট অদ্রীস আদিত্য ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে চলে যান। পরে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তারিকুজ্জামান সভা করে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে তাঁকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেন। অর্থাৎ কলেজে প্রশাসনিকভাবে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হলেও পুরোনো অধ্যক্ষের পদত্যাগের বৈধতা ও স্বেচ্ছায় পদত্যাগের প্রশ্নটি এখনো পুরোপুরি মীমাংসিত হয়নি—অদ্রীসের দাবি অন্তত এমনই।
একজন কলেজ অধ্যক্ষকে ঘিরে ২০২৪ সালের সেই ঘটনার দুই বছর পরও কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট নয়। তিনি কি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছিলেন, নাকি ভয়ভীতি ও চাপের মুখে? যদি পদত্যাগ স্বেচ্ছায় না হয়ে থাকে, তাহলে সেই পদত্যাগের আইনগত অবস্থান কী? সরকারি বিভিন্ন দপ্তর থেকে যোগদানের নির্দেশ দেওয়ার পরও তিনি কেন কর্মস্থলে যোগ দিতে পারছেন না? আর বেতন-ভাতা দেওয়ার নির্দেশ থাকার পরও কেন তা বাস্তবায়িত হয়নি? এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু অদ্রীস আদিত্যের চাকরির ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত নয়; এটি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্নও।
দুই বছর ধরে খুলনায় অবস্থান করা অদ্রীস আদিত্য এখনো অপেক্ষায় আছেন—কোনো রাজনৈতিক পক্ষের অনুগ্রহের জন্য নয়, তাঁর ভাষায়, একটি সুষ্ঠু ও বিধিসম্মত সিদ্ধান্তের জন্য। তাঁর চাওয়া একটাই—‘আমি যদি অপরাধ করে থাকি, বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিন। আর যদি অপরাধ না করে থাকি, তাহলে আমাকে আমার কর্মস্থলে ফিরিয়ে দিন।’

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

আরো খবর দেখুন
© All rights reserved © 2018
Design By BDit.com.bd