1. admin@dakshinanchal24.com : admin@dakshinanchal24.com :
সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ১১:৩৬ অপরাহ্ন

বিশ্বকাপ থেকে রেকর্ড ১২ বিলিয়ন ডলার আয়, ফিফার নতুন পরিকল্পনায় তীব্র আপত্তি উয়েফার

Reporter Name
  • Update Time : শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬
🖼️ ফটো কার্ড তৈরি করুন

স্পোর্টস: ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে রেকর্ড প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে ফিফা। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেঙ্েিকাতে আয়োজিত ৪৮ দলের এই বিশ্বকাপ থেকে টিকিট, আতিথেয়তা, সম্প্রচার, স্পনসরশিপসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক খাতের আয় ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির অর্থনৈতিক শক্তি আরও বাড়িয়েছে। এই বিশাল আয়ের সাফল্যের মধ্যেই ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বিশ্বকাপ ও সংস্থার বড় প্রতিযোগিতাগুলোর বাণিজ্যিক অধিকারকে আরও বড় পরিসরে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা সামনে এনেছেন।
ফিফার আনুষ্ঠানিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকেই এসেছে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার। এর আগে ২০২৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত চার বছরের চক্রে ফিফার মোট আয় প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর প্রত্যাশা ছিল। ফলে একক একটি বিশ্বকাপ ঘিরে এই বিপুল আয় ফুটবলকে ঘিরে ফিফার বাণিজ্যিক সম্ভাবনার ব্যাপকতা আরও স্পষ্ট করেছে।
বিশ্বকাপের আগে থেকেই আয় বাড়ানোর নানা উদ্যোগ নিয়েছিল ফিফা। টিকিট বিক্রি, বিজ্ঞাপন, উচ্চমূল্যের আতিথেয়তা প্যাকেজ, সম্প্রচার স্বত্ব এবং নতুন বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব ছিল এর বড় অংশ। এমনকি ম্যাচে পানির বিরতির মতো বিষয়ও বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করেছে সংস্থাটি। গত বছর অনুষ্ঠিত ক্লাব বিশ্বকাপকেও ফিফার নতুন বাণিজ্যিক মডেলের বড় পরীক্ষার অংশ হিসেবে দেখা হয়েছিল।
এই সাফল্যের পর ফিফা এবার আরও এক ধাপ এগোতে চাইছে। সংস্থার পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিশ্বকাপসহ ফিফার বড় প্রতিযোগিতাগুলোর বাণিজ্যিক ও ইভেন্ট কার্যক্রমকে এক ছাতার নিচে আনতে ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ বা এফএফই নামে একটি পৃথক প্রতিষ্ঠান গঠন করা হবে। এর আওতায় থাকবে সম্প্রচার স্বত্ব, স্পনসরশিপ, টিকিটিং, লাইসেন্সিং এবং ইভেন্ট পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কার্যক্রম।
ফিফার হিসাব অনুযায়ী, নতুন প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক মূল্যায়ন হতে পারে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার। পরিকল্পনাটি অনুমোদিত হলে ফিফা প্রতিষ্ঠানটির সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা ধরে রাখবে। একই সঙ্গে ফুটবলের প্রশাসন, প্রতিযোগিতা পরিচালনা, সূচি, নিয়মনীতি এবং সব ধরনের ক্রীড়া সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রণ ফিফার হাতেই থাকবে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
তবে পরিকল্পনার সবচেয়ে আলোচিত দিক হচ্ছে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের যুক্ত করা। এফএফইর সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত সংখ্যালঘু ও অ-নিয়ন্ত্রণকারী অংশীদারিত্ব বিক্রি করে প্রায় ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় ফিফা বিনিয়োগ ব্যাংক জে পি মরগানের সঙ্গে কাজ করছে।
সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের একটি গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছে জোশ কুশনারের প্রতিষ্ঠিত থ্রাইভ ইটার্নাল। কুশনারের ভাই জ্যারেড কুশনার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা। বিশ্বকাপকে ঘিরে ইনফান্তিনো ও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও এ পরিকল্পনাকে ঘিরে আলোচনায় এসেছে।
ফিফার ভাষ্য, এই উদ্যোগের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে সদস্য ফেডারেশনগুলোও আর্থিকভাবে লাভবান হবে। সংস্থাটির ২১১টি সদস্য ফেডারেশন রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, অনুমোদনের পর সদস্য ফেডারেশনগুলো এককালীন ২০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অর্থ পেতে পারে। পাশাপাশি ২০২৭ থেকে ২০৩০ সালের চক্রে ফিফা ফরোয়ার্ড উন্নয়ন তহবিল থেকেও অর্থ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ফিফা বলছে, সদস্য ফেডারেশনগুলো নতুন আর্থিক সুযোগ গ্রহণ করবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত তাদের নিজেদের। ইনফান্তিনোর বক্তব্যে সংস্থাটি এই উদ্যোগকে বিশ্বজুড়ে ফুটবলের আরও গণতান্ত্রিক বিকাশের অংশ হিসেবেও তুলে ধরেছে।
তবে এত বড় আর্থিক পরিকল্পনা নিয়ে সবাই স্বস্তিতে নেই। ফিফার পরিকল্পনা প্রকাশ্যে আসার পরই ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা তীব্র আপত্তি জানিয়েছে। তাদের প্রশ্ন, ফুটবলের বাণিজ্যিক অধিকারকে এমনভাবে বিনিয়োগকারীদের কাছে তুলে দেওয়া হলে ভবিষ্যতে খেলাটির সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রভাব কতটা বাড়বে।
উয়েফার বক্তব্য, ফুটবলের আত্মা ও সুশাসন কোনো বেচাকেনার সম্পদ নয়। তাদের মতে, ফুটবল কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয় এবং কারা এই পরিকল্পনা থেকে আর্থিকভাবে লাভবান হবে, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন।
উয়েফা আরও বলেছে, ফিফার এই উদ্যোগ নিয়ে সদস্য দেশগুলোর পাশাপাশি লিগ, ক্লাব, খেলোয়াড়, সমর্থক ও অন্যান্য অংশীজনেরও উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত। সংস্থাটি জানিয়েছে, ফিফার এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয়, যা ফুটবলের প্রশাসনিক কাঠামোর মৌলিক সীমারেখা অতিক্রম করে।
ইংল্যান্ড ও জার্মানির ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও এই উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিভিন্ন সমর্থক সংগঠনও পরিকল্পনাটির সমালোচনা করেছে। সাবেক ফিফা সভাপতি সেপ ব্লাটারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেছেন, “আমাদের খেলা বিক্রি করার অধিকার কারও নেই।”
অবশ্য প্রতিক্রিয়া সর্বত্র নেতিবাচক নয়। চেক ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডেভিড ট্রুন্ডা প্রকাশ্যে পরিকল্পনাটির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তবে তাদের অ্যাসোসিয়েশন আগস্টে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবে বলে জানা গেছে। কনকাকাফও স্বচ্ছতার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে এবং ফিফাকে সুশাসনের নীতি অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছে। এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনও একই ধরনের সতর্ক অবস্থান নিয়েছে, যদিও তারা সরাসরি পরিকল্পনাটির বিরোধিতা করেনি।
ফিফার এই বাণিজ্যিক বিস্তারের পেছনে অবশ্য নতুন কিছু নেই। ইনফান্তিনোর নেতৃত্বে এর আগেও বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা সামনে এসেছিল। ২০১৮ সালে জাপানের সফটব্যাংকের সমর্থনে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের একটি প্রস্তাব নিয়ে কাজ করেছিলেন তিনি। সেই পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল নতুন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা আয়োজন, যার মধ্যে সম্প্রসারিত পুরুষ ক্লাব বিশ্বকাপও ছিল। উয়েফার তীব্র বিরোধিতার মুখে সেই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
তবে কয়েক বছর পর ইনফান্তিনোর সেই ক্লাব বিশ্বকাপের পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ নেয়। যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত সম্প্রসারিত ক্লাব বিশ্বকাপকে ফিফা বড় বাণিজ্যিক প্রকল্প হিসেবে সামনে আনে। যদিও প্রত্যাশিত সম্প্রচার চুক্তি শুরুতে পাওয়া যায়নি। অ্যাপল টিভি প্লাসের সঙ্গে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি নিয়ে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর ফঙ্ স্পোর্টস ও এনবিসিও আগ্রহ দেখায়নি বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পরে ডিএজেডএন প্রায় একই অঙ্কের চুক্তি করে।
এরপর সৌদি আরবের সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এসইউআরজে স্পোর্টস ইনভেস্টমেন্ট ডিএজেডএনের প্রায় ১০ শতাংশ অংশীদারিত্ব নেয়। ২০৩৪ বিশ্বকাপের আয়োজক সৌদি আরবের সঙ্গে ফিফার বাণিজ্যিক ও ক্রীড়া সম্পর্কও এর ফলে আলোচনায় আসে।
ইনফান্তিনোর সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতাও এ আলোচনার বাইরে থাকছে না। ইনফান্তিনো ট্রাম্পের অভিষেক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন। পরে ২০২৬ বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে ট্রাম্পকে ফিফার নতুন ‘পিস প্রাইজ’ দেন তিনি। ট্রাম্প আবার ইনফান্তিনোর নাম জাতিসংঘের মহাসচিব পদের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে প্রস্তাব করেছেন বলে খবর রয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে এফএফইর সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে জোশ কুশনারের থ্রাইভ ইটার্নালের উপস্থিতিও বাড়তি আগ্রহ তৈরি করেছে। তবে ফিফা বলছে, তাদের ফুটবল পরিচালনার ক্ষমতা বা ক্রীড়া সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রণ কোনোভাবেই বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে যাবে না।
বিশ্বকাপ থেকে পাওয়া বিপুল আয় ইনফান্তিনোর অবস্থানও আরও শক্ত করেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপের আর্থিক সাফল্যের পর ২০৩১ সাল পর্যন্ত চতুর্থ ও শেষ মেয়াদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফিফা সভাপতি হিসেবে পুনর্র্নিবাচিত হওয়ার পথও তার জন্য সহজ হয়েছে। ২০২৩ সালে রুয়ান্ডায় পুনর্র্নিবাচনের সময় ইনফান্তিনো ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, কোনো প্রধান নির্বাহী যদি ধারাবাহিকভাবে এমন আর্থিক সাফল্য এনে দিতে পারেন, তাহলে তাকে আজীবন দায়িত্বে রাখার কথাও ভাবা যেতে পারে।
ফিফা সভাপতির পদ ছাড়ার পরও ইনফান্তিনো ফুটবলের বৈশ্বিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ কোনো দায়িত্বে থাকতে পারেন, এমন আলোচনা বহুদিন ধরেই রয়েছে। বর্তমান পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এফএফই পরিচালনার জন্য প্রধান নির্বাহী বা কমিশনারের মতো কোনো পদ তৈরি হতে পারে এবং সেই দায়িত্বে ইনফান্তিনোর সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে ফিফা জানিয়েছে, এমন কোনো বিষয় আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা করা হয়নি।
এফএফই নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের সময়সূচি এখনও নির্দিষ্ট করেনি ফিফা। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে সদস্য ফেডারেশনগুলোর অনুমোদন প্রয়োজন হবে। আগামী ২৩ নভেম্বর, সোমবার অনলাইনে ফিফা কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে ২০৩১ ও ২০৩৫ সালের নারী বিশ্বকাপের আয়োজক দেশের নাম চূড়ান্ত করার কথা রয়েছে।
সব মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে পাওয়া প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড আয় এখন ফিফার জন্য শুধু আর্থিক সাফল্যের হিসাব নয়, বরং ভবিষ্যতের ফুটবল ব্যবসার নতুন কাঠামো তৈরির বড় ভিত্তি হয়ে উঠছে। একদিকে ফিফা বলছে, এতে সদস্য ফেডারেশনগুলো আরও অর্থ পাবে এবং ফুটবলের উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়বে। অন্যদিকে উয়েফাসহ সমালোচকদের আশঙ্কা, বিপুল বাণিজ্যিক স্বার্থ ঢ়ুকে পড়লে ফুটবলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পরিচালনায় অর্থের প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
শেষ পর্যন্ত ২০২৬ বিশ্বকাপের ১২ বিলিয়ন ডলারের আয় ফিফাকে কতটা শক্তিশালী করবে, আর সেই শক্তি বিশ্ব ফুটবলের কাঠামোকে কোন দিকে নিয়ে যাবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

আরো খবর দেখুন
© All rights reserved © 2018
Design By BDit.com.bd