Dhaka ০৩:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৪ মে ২০২৬, ২১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জ্বালানি সংকটে সংবাদে ধীরগতি/ তথ্যপ্রবাহে শঙ্কা

  • Reporter Name
  • Update Time : ১২:২৩:২৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল ২০২৬
  • ২৬ Time View
পাইকগাছা (খুলনা) প্রতিনিধি: খুলনার পাইকগাছায় চলমান তীব্র জ্বালানি সংকট এবার সরাসরি আঘাত হেনেছে মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকতায়। তথ্য সংগ্রহ, ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছানো এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো এখন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে শুধু সাংবাদিকরাই নন, সাধারণ মানুষও সময়মতো সঠিক তথ্য পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার একমাত্র পেট্রোল পাম্পটি দিনের অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকছে। কখনো তেল সরবরাহ এলেও তা সীমিত সময়ের জন্য দেওয়া হচ্ছে। এতে করে মোটরসাইকেলনির্ভর সাংবাদিকরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক সময় খালি হাতে ফিরছেন। কেউ কেউ ২ থেকে ৩ ঘণ্টা অপেক্ষার পরও তেল না পেয়ে বাধ্য হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
এই পরিস্থিতিতে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে সংবাদ সংগ্রহ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, সহিংসতা কিংবা জরুরি মানবিক ঘটনার সংবাদ সংগ্রহে দ্রুত উপস্থিতি সম্ভব হচ্ছে না। এতে করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সময়মতো গণমাধ্যমে আসছে না, যা তথ্যপ্রবাহে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি করছে।
অন্যদিকে, বিকল্প হিসেবে ভাড়ায় যানবাহন ব্যবহার করতে গিয়ে সাংবাদিকদের গুনতে হচ্ছে তিনগুণ পর্যন্ত বাড়তি খরচ। সীমিত আয়ের অনেক সাংবাদিকের জন্য এটি একটি বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে অনেকেই অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ কাভার করা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।
পাইকগাছা প্রেসক্লাবের সভাপতি অ্যাডভোকেট এফ এম এ রাজ্জাক বলেন, “সাংবাদিকতা একটি জরুরি সেবা। যেকোনো ঘটনার খবর দ্রুত সংগ্রহ ও প্রচার করা আমাদের দায়িত্ব। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলে সেই দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হয় না। সাংবাদিকদের জন্য কোনো অগ্রাধিকার না থাকায় বাস্তবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহই ব্যাহত হচ্ছে।” তিনি সাংবাদিকদের জন্য আলাদা কোটা বা বিশেষ ব্যবস্থার জোর দাবি জানান।
উপজেলার একাধিক সাংবাদিক একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, মোটরসাইকেল ছাড়া মাঠপর্যায়ে কাজ করা প্রায় অসম্ভব। অথচ বর্তমান পরিস্থিতিতে দিনের অর্ধেক সময়ই চলে যাচ্ছে তেল সংগ্রহের চেষ্টায়। এতে করে সংবাদ সংগ্রহের গতি যেমন কমছে, তেমনি পেশাগত মানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এদিকে জ্বালানি সংকটকালীন সময়ে জরুরি সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তেল সরবরাহের নির্দেশনা দিয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। বাংলাদেশ ট্যাংকলরি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ জ্বালানি তেল পরিবেশক সমিতি খুলনা বিভাগ থেকে ডাক্তার, পুলিশ, প্রশাসন ও সাংবাদিকদের পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে তেল দেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে এর তেমন কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
এ বিষয়ে জানতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
সচেতন মহলের মতে, একটি গণতান্ত্রিক সমাজে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে সাংবাদিকদের নিরবচ্ছিন্ন চলাচল অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে যদি সাংবাদিকরাই মাঠে যেতে না পারেন, তাহলে জনগণ নির্ভরযোগ্য তথ্য থেকে বঞ্চিত হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
পাইকগাছায় কর্মরত সাংবাদিকরা দ্রুত প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের দাবি, পরিচয়পত্র প্রদর্শনের ভিত্তিতে প্রতিটি পাম্পে সাংবাদিকদের জন্য আলাদা বুথ বা দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা হোক। অন্যথায় মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকতা আরও স্থবির হয়ে পড়বে এবং তথ্যপ্রবাহে তৈরি হবে দীর্ঘস্থায়ী সংকট।
Tag :
About Author Information

জ্বালানি সংকটে সংবাদে ধীরগতি/ তথ্যপ্রবাহে শঙ্কা

Update Time : ১২:২৩:২৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল ২০২৬
পাইকগাছা (খুলনা) প্রতিনিধি: খুলনার পাইকগাছায় চলমান তীব্র জ্বালানি সংকট এবার সরাসরি আঘাত হেনেছে মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকতায়। তথ্য সংগ্রহ, ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছানো এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো এখন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে শুধু সাংবাদিকরাই নন, সাধারণ মানুষও সময়মতো সঠিক তথ্য পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার একমাত্র পেট্রোল পাম্পটি দিনের অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকছে। কখনো তেল সরবরাহ এলেও তা সীমিত সময়ের জন্য দেওয়া হচ্ছে। এতে করে মোটরসাইকেলনির্ভর সাংবাদিকরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক সময় খালি হাতে ফিরছেন। কেউ কেউ ২ থেকে ৩ ঘণ্টা অপেক্ষার পরও তেল না পেয়ে বাধ্য হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
এই পরিস্থিতিতে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে সংবাদ সংগ্রহ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, সহিংসতা কিংবা জরুরি মানবিক ঘটনার সংবাদ সংগ্রহে দ্রুত উপস্থিতি সম্ভব হচ্ছে না। এতে করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সময়মতো গণমাধ্যমে আসছে না, যা তথ্যপ্রবাহে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি করছে।
অন্যদিকে, বিকল্প হিসেবে ভাড়ায় যানবাহন ব্যবহার করতে গিয়ে সাংবাদিকদের গুনতে হচ্ছে তিনগুণ পর্যন্ত বাড়তি খরচ। সীমিত আয়ের অনেক সাংবাদিকের জন্য এটি একটি বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে অনেকেই অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ কাভার করা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।
পাইকগাছা প্রেসক্লাবের সভাপতি অ্যাডভোকেট এফ এম এ রাজ্জাক বলেন, “সাংবাদিকতা একটি জরুরি সেবা। যেকোনো ঘটনার খবর দ্রুত সংগ্রহ ও প্রচার করা আমাদের দায়িত্ব। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলে সেই দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হয় না। সাংবাদিকদের জন্য কোনো অগ্রাধিকার না থাকায় বাস্তবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহই ব্যাহত হচ্ছে।” তিনি সাংবাদিকদের জন্য আলাদা কোটা বা বিশেষ ব্যবস্থার জোর দাবি জানান।
উপজেলার একাধিক সাংবাদিক একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, মোটরসাইকেল ছাড়া মাঠপর্যায়ে কাজ করা প্রায় অসম্ভব। অথচ বর্তমান পরিস্থিতিতে দিনের অর্ধেক সময়ই চলে যাচ্ছে তেল সংগ্রহের চেষ্টায়। এতে করে সংবাদ সংগ্রহের গতি যেমন কমছে, তেমনি পেশাগত মানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এদিকে জ্বালানি সংকটকালীন সময়ে জরুরি সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তেল সরবরাহের নির্দেশনা দিয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। বাংলাদেশ ট্যাংকলরি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ জ্বালানি তেল পরিবেশক সমিতি খুলনা বিভাগ থেকে ডাক্তার, পুলিশ, প্রশাসন ও সাংবাদিকদের পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে তেল দেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে এর তেমন কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
এ বিষয়ে জানতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
সচেতন মহলের মতে, একটি গণতান্ত্রিক সমাজে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে সাংবাদিকদের নিরবচ্ছিন্ন চলাচল অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে যদি সাংবাদিকরাই মাঠে যেতে না পারেন, তাহলে জনগণ নির্ভরযোগ্য তথ্য থেকে বঞ্চিত হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
পাইকগাছায় কর্মরত সাংবাদিকরা দ্রুত প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের দাবি, পরিচয়পত্র প্রদর্শনের ভিত্তিতে প্রতিটি পাম্পে সাংবাদিকদের জন্য আলাদা বুথ বা দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা হোক। অন্যথায় মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকতা আরও স্থবির হয়ে পড়বে এবং তথ্যপ্রবাহে তৈরি হবে দীর্ঘস্থায়ী সংকট।