বিদেশ: মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করার ক্ষেত্রে ইরানের সামরিক বাহিনী দিন দিন আরো শক্তিশালী ও কার্যকর হয়ে উঠছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একাধিক মার্কিন সংবাদমাধ্যম বেনামি কমকর্তাদের বরাত দিয়ে এ খবর প্রকাশ করেছে। গত রোববার রাশিয়ার সংবাদমাধ্যম আরটি এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সমপ্রতি জর্ডানে একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর এই তথ্য সামনে এলো। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় তিনজন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। গত শনিবার প্রকাশিত একটি নিবন্ধে নিউ ইয়র্ক টাইমস তাদের সূত্রের বরাত দিয়ে উল্লেখ করেছে, “ইরানের এই সামপ্রতিক প্রতিশোধমূলক হামলা প্রমাণ করে যে তেহরানের কাছে কেবল বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবস্থাপনাই নেই, বরং তারা মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়ার ক্ষেত্রে আরো বেশি পারদর্শী হয়ে উঠেছে।” একইভাবে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বেনামি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, “ইরানি সামরিক বাহিনী মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে। তারা এখন এমন সব ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে যা প্রচণ্ড গতিতে ধেয়ে আসার পাশাপাশি মাঝ আকাশেই দিক পরিবর্তন করতে পারে।” নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, “গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ সামরিক অভিযান শুরুর প্রাক্কালে পেন্টাগন সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কাতার থেকে তাদের বেশ কিছু সৈন্য জর্ডান ও ইসরায়েলে সরিয়ে নিয়েছিল। ইরান সীমান্ত থেকে দূরে হওয়ায় মার্কিন সামরিক নেতৃত্ব এই অঞ্চলকে নিরাপদ মনে করেছিল।” গত রোববার মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক রাজনৈতিক বিশ্লেষক দাউদ কুততাব রুশ সংবাদমাধ্যম আরটি-কে বলেন, “মার্কিনিরা জর্ডানকে নিরাপদ ভাবলেও আদতে ইরানের কোনো সীমারেখা নেই।” মার্কিন বাহিনীর ওপর এই বিধ্বংসী হামলার খবর এমন এক সময়ে এলো যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করে আসছিলেন যে, মার্কিন বিমান হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস হয়ে গেছে। গত জুনে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছিলেন, “ইরানের বেশিরভাগ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র কারখানা ধ্বংস করা হয়েছে এবং দেশটির অস্ত্রাগার আগের তুলনায় মাত্র ২১ শতাংশে নেমে এসেছে।” তবে গত শনিবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড সেন্টকম জানায়, গত শুক্রবার জর্ডানের একটি সামরিক স্থাপনায় ইরানের ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও কামিকাজে ড্রোন হামলার পর দুজন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন এবং অন্য একজনের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। গত রোববার সেন্টকম নতুন এক বিবৃতিতে জানায়, জর্ডানে ইরানি হামলায় নিখোঁজ হওয়া মার্কিন সেনার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া, গত শনিবার উত্তর ইরাকে ভূপাতিত হওয়া একটি ইরানি আত্মঘাতী ড্রোনের অবিস্ফোরিত অংশ নিষ্ক্রিয় করার সময় বিস্ফোরণে আরো এক মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। এদিকে, নিউ ইয়র্ক টাইমস বেনামি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলেছে, চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে অন্তত তিনটি পৃথক সময়ে জর্ডানে মার্কিন সামরিক কর্মীরা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হয়েছেন। এসব হামলায় ডজন খানেক মার্কিন সেনাসদস্য আহত হয়েছেন এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্ল্যাকহক হেলিকপ্টার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উল্লেখ্য, গত ১৭ জুন ইসলামাবাদের সমঝোতা স্মারকের আওতায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ৬০ দিনের একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল। তবে চলতি মাসের শুরুতে চুক্তিটি ভেঙে যাওয়ার পর, গত এক সপ্তাহে ধরে ওয়াশিংটন ও তেহরান প্রতিদিনই একে অপরের ওপর হামলা চালাচ্ছে। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিভাবাদি আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছেন। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তিটিকে ‘মৃত’ বলে ঘোষণা করেন। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত এখন এক নতুন ও আরো বিপজ্জনক মোড় নিচ্ছে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।