মোরেলগঞ্জ (বাগেরহাট) প্রতিনিধি: বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার কুমারিয়াজোলা গ্রামের দারুল কোরআন ফজলুল করিম দাখিল মাদ্রাসায় দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগত নানা সংকট বিরাজ করছে। ইবতেদায়ি থেকে দাখিল পর্যন্ত ৩০০-এর অধিক শিক্ষার্থী নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হলেও পর্যাপ্ত ও নিরাপদ শ্রেণিকক্ষের অভাবে জরাজীর্ণ টিনশেডে পাঠদান করতে হচ্ছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক পাঠদান কার্যক্রম।
১৯৭৫ সালে মরহুম আব্দুল হামিদ কাজীর প্রতিষ্ঠিত এ মাদ্রাসায় বর্তমানে ১৪ জন শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে আসা প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হওয়ায় শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, মাদ্রাসার কয়েকটি শ্রেণিকক্ষের টিনের বেড়া ও কাঠামো অনেকটাই জরাজীর্ণ। কোথাও কাঠ ও বাঁশের ওপর কোনোমতে টিনের বেড়া দিয়ে শ্রেণিকক্ষ তৈরি করা হয়েছে। টিনের বিভিন্ন অংশে ছিদ্র থাকায় শ্রেণিকক্ষগুলো অনেকটাই অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। এতে বাইরে থেকে আলো-বাতাসের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রাণীও শ্রেণিকক্ষে ঢুকে পড়ার সুযোগ রয়েছে।
প্রচণ্ড গরমের মধ্যে এসব টিনশেড শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য কষ্টকর হয়ে পড়ে। বর্ষাকালে জরাজীর্ণ ছাদ ও বেড়ার কারণে পাঠদান আরও ব্যাহত হয় বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
মাদ্রাসাটিতে ছাত্রীদের জন্য নেই কোনো কমন রুম। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট ও নিরাপদ খাবার পানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও নেই বলে জানিয়েছেন কয়েকজন ছাত্রী।
দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী তামান্না আক্তার বলেন, মাদ্রাসায় পড়াশোনার জন্য উপযুক্ত পরিবেশের পাশাপাশি ছাত্রীদের জন্য আলাদা কমন রুম ও স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট প্রয়োজন। নিরাপদ খাবার পানির ব্যবস্থাও জরুরি।
তিনি বলেন, “আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাই, দ্রুত আমাদের মাদ্রাসায় একটি স্থায়ী ভবন, পাকা ও স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট, ছাত্রীদের জন্য একটি কমন রুম এবং নিরাপদ খাবার পানির ব্যবস্থা করা হোক।”
তার মতে, এসব মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে মাদ্রাসার শিক্ষার পরিবেশ আরও উন্নত হবে এবং শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও বাড়বে।
মাদ্রাসার সুপার মোঃবিল্লাল হোসেন জানান, সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও শিক্ষকরা নিয়মিত পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন জরুরি।
তিনি বলেন, মাদ্রাসাটিতে দীর্ঘদিন ধরে শ্রেণিকক্ষসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত সংকট রয়েছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনায় প্রয়োজনীয় শ্রেণিকক্ষ ও অন্যান্য সুবিধা পর্যাপ্ত নয়। এসব সংকট নিরসনে স্থায়ী ভবনসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন দরকার।
মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষিকা শহিদা খানম ও ফাতেমা আক্তার বলেন, জরাজীর্ণ টিনশেড শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করতে গিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নানা সমস্যায় পড়তে হয়। বিশেষ করে প্রচণ্ড গরম ও বর্ষার সময় সমস্যাটি আরও প্রকট হয়।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদানের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত শ্রেণিকক্ষের পাশাপাশি ছাত্রীদের কমন রুম, স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা থাকা জরুরি। এসব সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ আরও ভালো হবে।
তবে মাদ্রাসাটির অবকাঠামোগত সংকট নিরসনে ইতোমধ্যে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাগেরহাট-৪ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মোঃ আব্দুল আলীমের থোক বরাদ্দ থেকে মাদ্রাসাটিকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। ওই অর্থ দিয়ে মাদ্রাসার উত্তর পাশে নতুন একটি টিনশেড অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, উত্তর পাশে নতুন টিনশেড নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, মাদ্রাসার সামগ্রিক চাহিদার তুলনায় এই উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য একটি স্থায়ী ভবন নির্মাণের পাশাপাশি ছাত্রীদের কমন রুম, পাকা টয়লেট, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা এবং খেলার মাঠ প্রয়োজন।
মাদ্রাসাটিতে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার জন্য নির্দিষ্ট কোনো খেলার মাঠ নেই। ফলে পড়াশোনার পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় খেলাধুলার সুযোগ থেকেও শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছে।
এদিকে স্থানীয়রা জানান, মাদ্রাসায় যাতায়াতের জন্য প্রায় ২ থেকে ৩ কিলোমিটার সড়ক কাঁচা ও চলাচলের অনুপযোগী। বর্ষা মৌসুমে এ দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। যোগাযোগব্যবস্থার সমস্যার কারণে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভোগান্তি পোহাতে হয়।
স্থানীয় অভিভাবকদের ভাষ্য, প্রত্যন্ত এলাকার এই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দিয়ে আসছে। কিন্তু অবকাঠামোগত দুরবস্থা ও মৌলিক সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি দূর করা না গেলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টরা জানান, সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও শিক্ষকরা নিয়মিত পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থীর জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করতে দ্রুত স্থায়ী ভবন নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন জরুরি।
শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও শিক্ষা কর্তৃপক্ষ মাদ্রাসাটির বাস্তব অবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। পাশাপাশি স্থায়ী ভবন নির্মাণ, পাকা স্যানিটেশন ব্যবস্থা, নিরাপদ পানির সরবরাহ, ছাত্রীদের কমন রুম, খেলার মাঠ এবং যাতায়াত সড়কের উন্নয়ন করা হবে।
তাদের মতে, এসব মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে মাদ্রাসাটির শিক্ষার পরিবেশ উন্নত হওয়ার পাশাপাশি প্রত্যন্ত এলাকার শত শত শিক্ষার্থীর মানসম্মত শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ আরও সুগম হবে।