বিেেদশ : আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে পুরো গ্রাম ভেসে গিয়ে অন্তত ১৬৫ জনের মৃত্যু এবং ১ হাজারেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ হওয়ার পর গতকাল বৃহস্পতিবার নেপাল-তিব্বত সীমান্তে জীবিতদের উদ্ধারে জোর তৎপরতা শুরু করেছে উদ্ধারকারী দলগুলো। মৃতদের মধ্যে অন্তত ১৬২ জন নেপালে এবং তিনজন তিব্বতে মারা যায়। গত বুধবার সকালে হিমালয়ের একটি হিমবাহের অংশ ভেঙে নদীতে বিশাল বরফুপাথরের ধস নামে। এতে নদীর প্রবাহ আটকে যায় এবং পরে বাঁধা ভেঙে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, প্রায় ৫,২০০ মিটার উচ্চতা থেকে হিমবাহের অংশ ভেঙে পড়ে এবং নিচে গিয়ে নদীকে আঘাত করে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল ভূমিকম্পে ধস নেমেছে, তবে পরে নিশ্চিত হয় যে ভূমিধসের ধাক্কাতেই কম্পন তৈরি হয়েছিল। সীমান্তের চীনা অংশ থেকে পাওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, গত বুধবার সকালে কয়েক তলা বিশিষ্ট একটি ভবনের ওপর সুবিশাল কাদা ও ধ্বংসাবশেষের স্তূপ আছড়ে পড়ছে এবং নিচে বহু মানুষ প্রাণের ভয়ে দৌড়ে পালাচ্ছেন। পানির তীব্র তোড়ে বাস ও গাড়িগুলো খেলনার মতো ভেসে যায়। ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভের ধারণা, হিমবাহ ধসের ফলে সৃষ্ট কাদাস্রোতের তীব্র প্রবাহ চারপাশের এলাকা প্লাবিত করেছে। এই দুর্যোগে নিখোঁজদের অনেকেই বিদেশি পর্যটক বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ভোট কোশি ও ত্রিশূলী-এই দুটি নদীর গতিপথে থাকা শহর ও গ্রামগুলোতে সুনামির মতো বয়ে যাওয়া পানি ও কাদার তীব্র প্রবাহ আঘাত হানে। নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, তারা এখন পর্যন্ত ১৬২টি মরদেহ উদ্ধার করেছে। সীমান্তের ওপারে চীনা রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম জানিয়েছে, তিব্বতের জিরোং বন্দরে এই ‘কাদাস্রোত দুর্যোগে’ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ২৬০ জন বিদেশি নাগরিকসহ মোট ৫৫৮ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। নেপালের নুয়াকোট জেলার ৫৬ বছর বয়সী ব্যবসায়ী রাজু ভাদেল তাঁর ভগ্নিপতির কাছ থেকে পাওয়া আকুল আকুতির এক ফোন কলের কথা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, তারা কাঁদছিল এবং বলছিল যে তাদের পুরো বাড়ি ভেসে গেছে। পরিবারের তিন সদস্যকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও তার ভাই এখনো নিখোঁজ। নুয়াকোটের শিক্ষক মনোক মিশ্রও স্বচক্ষে দেখেন, ‘মানুষসহ নয়টি ট্রাক বন্যায় ভেসে যাচ্ছে’।
স্থলভাগের সুনামি
বন্যায় বহুতল ভবনের নিচের তলাগুলো তলিয়ে যাওয়ার পর উদ্ধারকারীরা কাদা ও পলি ঠেলে জীবিতদের খোঁজে তল্লাশি চালান। নেপালের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মতে, দুর্যোগ আঘাত হানার এক দিন পরও প্রায় ৪৬৮ জন পর্যটক- যাদের মধ্যে ৩৯৩ জন বিদেশি, এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। তবে প্রভাবিত এলাকাগুলোতে এখনো কতজন স্থানীয় বাসিন্দা নিখোঁজ রয়েছেন, সে বিষয়ে নেপাল কোনো নির্দিষ্ট তথ্য দেয়নি। চীনা রাষ্ট্রীয় সমপ্রচারমাধ্যম সিসিটিভি-র বরাত দিয়ে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চীনের অংশে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিকসহ ৫৫৮ জন নিখোঁজকে খুঁজছেন উদ্ধারকারীরা। নেপাল পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, যোগাযোগবিচ্ছিন্ন বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক রয়েছেন। লা ট্রোব ইউনিভার্সিটির পরিবেশ বিষয়ক ঐতিহাসিক রুথ গ্যাম্বল বলেন, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের এই প্রবাহটি ছিল ‘স্থলভাগের সুনামির মতো, যা ভোট কোশি উপত্যকা হয়ে মধ্য নেপালের দিকে প্রায় ১৭০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছে’। তিনি আরও বলেন,‘কাঠমান্ডু থেকে লাসা ভ্রমণকারী আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি রুট’। ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজের (আইএফআরসি) নেপাল প্রধান ডেভিড ফিশার বলেন, ‘পুরো গ্রাম এবং বাজার এলাকা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে’। সংস্থাটি জানায়, তারা কম্বল, ফার্স্ট এইড কিট, স্ট্রেচার ও বডি ব্যাগসহ জরুরি ত্রাণ সামগ্রী পাঠাচ্ছে। চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, উদ্ধার তৎপরতায় সহায়তার জন্য তিব্বত সরকার প্রায় ৮০০ জন জরুরি কর্মী, ১৫০টি যানবাহন, অনুসন্ধানী কুকুর ও স্পিডবোট মোতায়েন করেছে। গত বুধবার ভোরের দিকে দুর্যোগ আঘাত হানার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা এর কারণ স্পষ্ট ছিল না। তবে ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে জানিয়েছে, একটি হিমবাহ ধসের কারণেই এই কম্পন তৈরি হয় এবং নেপাল ও তিব্বতের নিম্নাঞ্চলে এই ‘বিপর্যয়কর’ প্রভাব পড়ে।
সংস্থাটি জানায়, ‘এই ঘটনাটি শুরুতে ৪.৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে রিপোর্ট করা হয়েছিল। তবে নিকটবর্তী ভূকম্পন কেন্দ্র, দীর্ঘ মেয়াদী ভূকম্পন তরঙ্গ এবং স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণের পর নিশ্চিত হওয়া গেছে যে এটি কোনো ভূমিকম্প ছিল না, বরং হিমবাহ ধস ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ ছিল’। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বব্যাপী হিমবাহ গলে যাচ্ছে, যা হিমবাহ হ্রদের বন্যা ও হিমবাহ ধসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, নদীর উজানে কোনো বাধা বা ব্লকেজ আটকে থাকলে তা থেকে দ্বিতীয় দফায় বন্যা হতে পারে। নেপাল পুলিশের শেয়ার করা ছবিতে নদীতে উপচে পড়া পানি এবং তার গতিপথে থাকা বাড়িঘর ভেসে যেতে দেখা যায়। অন্যদিকে বার্তা সংস্থা এএফপি-র ছবিতে কাদা দিয়ে ঢাকা পড়া একটি বাড়ির শুধু ওপরের তলাটি জেগে থাকতে দেখা গেছে। নেপালের উত্তরাঞ্চলের রসুয়া জেলা প্রথম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে বন্যার পানি যতই নিম্নাঞ্চলের দিকে গড়িয়েছে, ভারতের সীমান্তবর্তী দক্ষিণাঞ্চলীয় চিতওয়ান পর্যন্ত মোট সাতটি নেপালি জেলা থেকে মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বর্ষা মৌসুমে অনেক ট্রেকিং এজেন্সি ট্যুর পরিচালনা না করলেও, এই অঞ্চলে তীর্থযাত্রীসহ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পর্যটক অবস্থান করছিলেন। বন্যার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে স্যাব রুবেসি-যা জনপ্রিয় ট্রেকিং এরিয়াগুলোর প্রবেশদ্বার এবং বৌদ্ধ ও হিন্দুদের পবিত্র স্থান কৈলাশ পর্বতের পাদদেশে যাওয়া তীর্থযাত্রীদের রুট। নেপালি সেনাবাহিনী হেলিকপ্টার দিয়ে বহু মানুষকে উদ্ধার করেছে। অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নদীর তীরে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হয়েছে। সিসিটিভি-র মতে, চীনের নেতা শি জিনপিং বলেছেন, ‘সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার বা জরুরি কাজ হলো নিখোঁজ ব্যক্তিদের খোঁজা ও উদ্ধারে সম্ভাব্য সবকিছু করা’। তিব্বতের শিগাৎসের ট্রাফিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই এলাকার রাস্তাগুলো ‘কাদাস্রোতের ঝুঁকিতে রয়েছে এবং চলাচলের জন্য নিরাপদ নয়’। কাঠমান্ডুভিত্তিক ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট’ (আইসিআইএমওডি)-এর জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিভাগের প্রধান চিয়াংকং ঝাং দ্বিতীয় দফায় বন্যার সম্ভাবনার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি এএফপি-কে বলেন, ‘নেপাল-চীন সীমান্ত নদীতে উজানে এখনো একটি ব্লকেজ বা বাধায় আটকে থাকায়, কর্তৃপক্ষ দ্বিতীয়বার বন্যার সৃষ্টি হতে পারে বলে সতর্ক করছে’।