মোঃ নাজমুল, মোরেলগঞ্জ (বাগেরহাট) প্রতিনিধি বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাধারণ ভবিষ্যত তহবিলের (জিপিএফ) প্রায় ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা সামনে এসেছে। কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে ভুয়া বিল ও জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি তহবিলের এই অর্থ তুলে নেওয়ার অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর বর্তমান বাগেরহাট জেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তাসহ উপজেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের তিন কর্মকর্তা ও দুই সাবেক অডিটরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোরেলগঞ্জ উপজেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মোট ৯ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ২০০ টাকা সরকারি তহবিল থেকে আত্মসাৎ করেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৩৯ ধারার উপধারা-১ অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে সাময়িক বরখাস্তের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) কার্যালয় এবং হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের (সিজিএ) কার্যালয় থেকে পৃথক প্রজ্ঞাপন ও অফিস আদেশের মাধ্যমে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বরখাস্ত থাকাকালে সংশ্লিষ্টরা প্রচলিত বিধি অনুযায়ী খোরাকি ভাতা পাবেন।
বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তারা হলেন—মোরেলগঞ্জের সাবেক উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মীর এনামুল হক, সৌমেন সরকার, মদন কুমার দাস ও হাসানুজ্জামান। এছাড়া একই কার্যালয়ের সাবেক অডিটর শ্যামল কুমার দাস ও রুবেল মোল্লা রয়েছেন।
তাদের মধ্যে মীর এনামুল হক বর্তমানে রামপাল উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, সৌমেন সরকার খুলনার তেরখাদা উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, মদন কুমার দাস বাগেরহাটের ডিএএফও কার্যালয়ের ডিস্ট্রিক্ট অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স অফিসার এবং হাসানুজ্জামান খুলনা বিভাগীয় কন্ট্রোলার অব অ্যাকাউন্টস কার্যালয়ের অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অডিটর শ্যামল কুমার দাস বর্তমানে মোংলায় এবং রুবেল মোল্লা শরণখোলায় কর্মরত।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মীর এনামুল হক অনলাইন সিস্টেমে নিজের ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে ৫২টি জিপিএফ ফান্ডের অগ্রিম বিলের বিপরীতে ৪ কোটি ৩২ লাখ ৩৬ হাজার ৪০০ টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
সৌমেন সরকার তিনটি অগ্রিম বিলের মাধ্যমে ১৭ লাখ ৯২ হাজার টাকা, মদন কুমার দাস পাঁচটি অগ্রিম বিলের বিপরীতে ১২ লাখ টাকা এবং হাসানুজ্জামান দুটি অগ্রিম বিলের মাধ্যমে ৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, সাবেক অডিটর শ্যামল কুমার দাস ২০২২-২৩ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত ৬৫টি ভুয়া বিল তৈরি করে ৪ কোটি ৮১ লাখ ৯৬ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। একইভাবে অডিটর রুবেল মোল্লা ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১২টি ভুয়া বিলের মাধ্যমে ২৩ লাখ ২১ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
সব মিলিয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে আত্মসাতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ২০০ টাকা।
ঘটনার সূত্রপাত হয় কয়েকজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক জিপিএফ থেকে ঋণ নিতে গিয়ে তাদের হিসাবের গরমিল দেখতে পাওয়ার পর। ঋণ উত্তোলনের সময় হিসাব যাচাই করতে গিয়ে নিজেদের অজান্তেই তাদের জিপিএফ হিসাবে বড় অঙ্কের লেনদেনের তথ্য দেখতে পান তারা।
পরে মোরেলগঞ্জ উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা তন্ময় গোস্বামী জিপিএফ হিসাবের সঠিকতা যাচাইয়ের জন্য খুলনার ডিভিশনাল কন্ট্রোলার অব অ্যাকাউন্টস কার্যালয়ে চিঠি দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি যাচাই করতে কমিটি গঠন করা হয়।
ভুক্তভোগী কয়েকজন শিক্ষক জানান, জিপিএফের অর্থ নিয়ে এ ধরনের লেনদেন সম্পর্কে তারা কিছুই জানতেন না। হিসাব যাচাইয়ের সময় বিষয়টি তাদের নজরে আসে। কোনো কোনো শিক্ষকের হিসাবে একই দিনে বড় অঙ্কের টাকা জমা ও উত্তোলনের তথ্যও পাওয়া গেছে বলে তারা জানান।
শিক্ষকদের কয়েকজনের অভিযোগে জিপিএফের অর্থের এই অনিয়মের সঙ্গে মোরেলগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের সাবেক শিক্ষা কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান এবং অফিস সহকারী মোতালেবের নামও আলোচনায় এসেছে। তবে তাদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তদন্তে কী প্রমাণ পাওয়া গেছে, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
এছাড়া পুরো প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কারও ভূমিকা ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
কেন্দ্রীয় হিসাব মহানিয়ন্ত্রক এস এম রেজভী এ প্রতিবেদককে বলেন, গ্র্যাচুইটি বা আনুতোষিকের টাকা আত্মসাৎ করা গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। মোরেলগঞ্জে এ ধরনের গুরুতর অপরাধে জড়িত কর্মকর্তাদের প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিক্ষকদের খোয়া যাওয়া টাকা ফেরত দেওয়া হবে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তদন্ত শেষে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আত্মসাৎকৃত অর্থ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
মোরেলগঞ্জ উপজেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের এই ঘটনায় এখন মূল প্রশ্ন—শিক্ষকদের অজান্তে তাদের জিপিএফ হিসাবে কীভাবে ভুয়া বিল তৈরি ও অর্থ উত্তোলন করা হলো, এর সঙ্গে আর কারা জড়িত এবং দীর্ঘ সময় ধরে এ ধরনের লেনদেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর নজর এড়িয়ে গেল কীভাবে? এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে সংশ্লিষ্ট তদন্তের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল ও পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে আছেন ভুক্তভোগী শিক্ষকরা।