তারিক লিটু, কয়রা (খুলনা): সুন্দরবনঘেঁষা উপকূলীয় উপজেলা কয়রা। একসময় চুরি, মাদক, জুয়া ও নানা অপরাধের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ছিল উদ্বেগ। সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় অপরাধপ্রবণতার আশঙ্কা তৈরি হতো। তবে সময়ের সঙ্গে বদলাতে শুরু করেছে সেই চিত্র। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের তৎপরতা, নিয়মিত অভিযান এবং জনসম্পৃক্ত কার্যক্রমে কয়রায় ফিরছে স্বস্তি।
কয়রা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রাশেদুল আলম দায়িত্ব নেওয়ার পর গত কয়েক মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে নানা উদ্যোগ নিয়েছেন। মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়িয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে স্কুল-কলেজে গিয়ে শিক্ষার্থীদের মাদক ও জুয়া থেকে দূরে থাকার বিষয়ে সচেতন করছেন।
থানা সূত্রে জানা গেছে, ওসি মো. রাশেদুল আলম দায়িত্ব নেওয়ার পর জুয়া ও মাদকের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে জুয়ার সঙ্গে জড়িত ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। পাশাপাশি মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধেও অভিযান চালানো হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, পুলিশের নিয়মিত তৎপরতার কারণে আগে প্রকাশ্যে চলা অনেক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এখন অনেকটাই কমে এসেছে। বিশেষ করে জুয়া ও মাদকের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে পুলিশের অভিযানের কারণে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। অনেকে এলাকা ছেড়ে গা-ঢাকা দিয়েছে বলেও স্থানীয়দের কেউ কেউ জানিয়েছেন।
তবে শুধু অভিযানেই সীমাবদ্ধ থাকেননি ওসি মো. রাশেদুল আলম। অপরাধ দমনে সামাজিক সচেতনতা তৈরির ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। প্রতি শুক্রবার বিভিন্ন এলাকার মসজিদ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে গিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন। মাদক, জুয়া ও বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে এসব সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন।
পুলিশের এমন জনসম্পৃক্ত কার্যক্রমকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাশাপাশি সমাজের মানুষকে সম্পৃক্ত করা গেলে অপরাধ প্রতিরোধ আরও কার্যকর হয়।
কয়রা উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও নিয়মিত যাচ্ছেন ওসি রাশেদুল আলম। স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে মাদক, জুয়া ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরছেন। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়ার পাশাপাশি নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, থানায় সাধারণ মানুষের সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে। অভিযোগ নিয়ে আসা মানুষদের কথা শোনা, প্রয়োজনীয় আইনগত সহায়তা দেওয়া এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে পুলিশের তৎপরতা বেড়েছে বলে তাঁরা জানান।
সুন্দরবনঘেঁষা কয়রায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো রাখার বিষয়টি শুধু স্থানীয় জননিরাপত্তার জন্যই নয়, সুন্দরবনের নিরাপত্তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বন ও নদীকে ঘিরে নানা ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশের পাশাপাশি বন বিভাগ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে। এ ক্ষেত্রেও ওসি রাশেদুল আলমের দায়িত্ব পালনকালে সুন্দরবনকেন্দ্রিক অপরাধ দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখার কথা স্থানীয়রা উল্লেখ করেছেন।
কয়রার মানুষের প্রত্যাশা, পুলিশের এই তৎপরতা অব্যাহত থাকবে। অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে পুলিশের যোগাযোগ আরও বাড়লে অপরাধমুক্ত ও নিরাপদ কয়রা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
ওসি মো. রাশেদুল আলমের দায়িত্ব নেওয়ার পর কয়রা থানার কার্যক্রমে যে পরিবর্তনের কথা স্থানীয়রা বলছেন, সেটিকে টেকসই করতে প্রয়োজন ধারাবাহিকতা। কারণ অপরাধ দমন শুধু পুলিশের একার দায়িত্ব নয়; পুলিশ, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগেই গড়ে উঠতে পারে নিরাপদ কয়রা।
কয়রা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রাশেদুল আলম বলেন, “ডিআইজি মহোদয়, খুলনা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক এবং সার্কেল এসপি মোঃ আমির হামজার নির্দেশনা অনুযায়ী কয়রা উপজেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো রাখার জন্য আমরা সবসময় তৎপর আছি। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করাই আমাদের প্রধান দায়িত্ব।”
তিনি বলেন, “থানায় সাধারণ মানুষ যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে এসে তাঁদের সমস্যার কথা বলতে পারেন, সে বিষয়ে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। মানুষের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে পুলিশ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে।”
মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে পুলিশের অবস্থান তুলে ধরে ওসি রাশেদুল আলম বলেন, “মাদক, জুয়া, বাল্যবিবাহসহ সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। শুধু পুলিশ দিয়ে সব অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব নয়। এ জন্য সাধারণ মানুষকেও এগিয়ে আসতে হবে এবং পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানে গিয়ে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করছি। বিশেষ করে তরুণ ও শিক্ষার্থীরা যেন মাদক ও জুয়ার মতো অপরাধে জড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়ে আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলছি।”
কয়রার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পুলিশের সঙ্গে সাধারণ মানুষের যোগাযোগ বাড়লে অপরাধ দমনে তথ্যপ্রাপ্তিও সহজ হয়। স্থানীয় কোনো সমস্যা বা অপরাধের ঘটনা ঘটলে মানুষ যদি দ্রুত পুলিশকে জানায়, তাহলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
কয়রা থানায় সাধারণ মানুষের আসা-যাওয়া বাড়ার বিষয়টিকেও তাই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। তাঁদের মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো রাখতে পুলিশের পাশাপাশি জনগণের সহযোগিতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
খুলনার কয়রা উপজেলার স্থানীয় বাসিন্দা ও ভ্যানচালক ওজিয়র রহমান গাজী বলেন, “থানায় গিয়ে নিজের সমস্যার কথা বলতে পারলে মানুষের আস্থা বাড়ে। পুলিশ যদি সাধারণ মানুষের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়, তাহলে অপরাধীদের বিরুদ্ধে তথ্য দিতে সাধারণ মানুষও আরও উৎসাহিত হবে। বর্তমান ওসি আন্তরিক ও ভালো ব্যবহার করেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলে আমার ভালো লেগেছে।”