1. admin@dakshinanchal24.com : admin@dakshinanchal24.com :
রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০২ অপরাহ্ন

চিকিৎসাসেবার আলো হয়ে উঠেছেন কয়রার প্যারামেডিক মনোয়ার হোসেন

Reporter Name
  • Update Time : রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬
🖼️ ফটো কার্ড তৈরি করুন
তারিক লিটু, খুলনা: সুন্দরবনের কোলঘেঁষা খুলনার কয়রা উপজেলা। নদী, খাল আর বিস্তীর্ণ জনপদ ঘেরা এই উপকূলের মানুষের জীবন প্রতিদিনই নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে। কখনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কখনো লবণাক্ততা, আবার কখনো প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবার অভাব—সব মিলিয়ে এখানকার মানুষের জীবন যেন এক দীর্ঘ সংগ্রামের নাম। বিশেষ করে অসুস্থ হয়ে পড়লে সেই সংগ্রাম আরও কঠিন হয়ে ওঠে। কারণ, ভালো চিকিৎসকের কাছে যেতে হলে অনেক সময় পাড়ি দিতে হয় দীর্ঘ পথ। কয়রা সদর থেকে খুলনা শহরের দূরত্ব প্রায় ১২০ কিলোমিটার। জরুরি প্রয়োজনে রাতের বেলায় চিকিৎসক পাওয়া কিংবা দ্রুত উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানো অনেক পরিবারের জন্যই বড় দুশ্চিন্তার বিষয়।
এমন এক বাস্তবতায় কয়রার মানুষের কাছে ভরসার একটি নাম মোহাম্মদ মনোয়ার হোসেন। তিনি একজন কমিউনিটি প্যারামেডিক। দীর্ঘদিন ধরে কয়রা সদরে থেকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ দিয়ে আসছেন। প্রত্যন্ত উপকূলের যেসব মানুষ সহজে চিকিৎসাসেবা পান না, তাঁদের অনেকেই তাঁর কাছে আসেন পরামর্শ নিতে। সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা আর যোগাযোগের দুর্ভোগের মধ্যে তিনি চেষ্টা করেন মানুষের পাশে দাঁড়াতে।
কয়রার মানুষের কাছে তাঁর পরিচয় শুধু একজন চিকিৎসাসেবাদানকারী হিসেবে নয়, বরং বিপদের সময়ে কাছে পাওয়া একজন মানুষ হিসেবেও। অসুস্থ সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে যখন কোনো বাবা দিশেহারা হয়ে পড়েন, কিংবা পরিবারের কাউকে নিয়ে কী করবেন বুঝতে না পেরে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন, তখন কাছাকাছি কাউকে পাওয়া অনেক বড় স্বস্তি। মনোয়ার হোসেনের কাছে আসা মানুষের অভিজ্ঞতায় সেই স্বস্তির কথাই উঠে আসে।
কয়রার এক ভ্যানচালক আবু বকর বলেন, “আমার ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে মনোয়ার হোসেনের কাছে নিয়ে যাই। তিনি চিকিৎসা ও পরামর্শ দেন। পরে আমার ছেলে সুস্থ হয়ে ওঠে। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য কাছাকাছি এমন কাউকে পাওয়া অনেক উপকারের।”
আবু বকরের মতো নিম্ন আয়ের অনেক মানুষের কাছে চিকিৎসা নেওয়ার আগে খরচের হিসাবও বড় হয়ে দাঁড়ায়। সংসারের আয় সীমিত, অথচ অসুখের জন্য অপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এমন পরিস্থিতিতে এলাকার মধ্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ তাঁদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মনোয়ার হোসেনের কাছে আসা মানুষের মধ্যে রয়েছেন কয়রা সদরের বাসিন্দা, আশপাশের গ্রামের মানুষ এবং দুর্গম জনপদ থেকে আসা রোগীরাও।
কয়রার ভৌগোলিক বাস্তবতাই এখানকার স্বাস্থ্যসেবার সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। সুন্দরবনবেষ্টিত এই জনপদের সঙ্গে জেলা শহরের যোগাযোগ সহজ নয়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও যেতে হয় অনেককে দূরপথ পাড়ি দিয়ে। বিশেষ করে রাতের বেলায় অসুস্থ হয়ে পড়লে কিংবা জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে রোগী ও স্বজনদের উদ্বেগ বেড়ে যায়। যাতায়াতের ব্যবস্থা, অর্থের সংকট এবং দ্রুত চিকিৎসক না পাওয়ার আশঙ্কা—সব মিলিয়ে অসুস্থতার সঙ্গে যোগ হয় নতুন ভোগান্তি।
এই সংকট শুধু কয়রার মানুষের নয়। পাশের সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, চাকলা ও পাতাখালীর মতো দুর্গম এলাকার মানুষও যোগাযোগ ও চিকিৎসাসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা সমস্যার মুখোমুখি হন। এসব এলাকার কিছু মানুষ প্রয়োজনীয় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও পরামর্শের জন্য কয়রায় আসেন। তাঁদের কাছে নিকটবর্তী কোনো সেবাদানকারীর উপস্থিতি অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবে মনোয়ার হোসেনের কাজের পরিধি বুঝতে গেলে তাঁর পেশাগত পরিচয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। তিনি একজন কমিউনিটি প্যারামেডিক। তাঁর প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার ক্ষেত্র মূলত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ এবং বিভিন্ন রোগ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা। তিনি এমবিবিএস চিকিৎসক নন। তাই জটিল রোগ নির্ণয়, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা কিংবা জরুরি ও গুরুতর অসুস্থতার ক্ষেত্রে নিবন্ধিত চিকিৎসক ও উপযুক্ত হাসপাতালে রোগী পাঠানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি  শিশুস্বাস্থ্য ও পুষ্টি, ডায়াবেটিস সম্পর্কে সচেতনতা, হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধ, নারীস্বাস্থ্য, নিরাপদ ওষুধ ব্যবহার, নাক-কান-গলার রোগ প্রতিরোধ, মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্য এবং চোখের রোগের প্রাথমিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এসব প্রশিক্ষণ তাঁকে কমিউনিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যসচেতনতা ও প্রাথমিক সেবার কাজে সহায়তা করতে পারে। তবে প্রশিক্ষণ থাকা আর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে—এ বিষয়টি মাথায় রেখেই তাঁর সেবার ভূমিকা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
মনোয়ার হোসেনের পেশাগত পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের নিবন্ধন নম্বর ৪৫৫৭। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। তাঁর প্রশিক্ষণের মধ্যে রয়েছে শিশুস্বাস্থ্য ও পুষ্টি, শিশুদের জরুরি রোগ ও রোগ প্রতিরোধ, হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধ, ডায়াবেটিস সম্পর্কে সচেতনতা, স্ত্রীরোগ বিষয়ে সচেতনতা, কমিউনিটি স্বাস্থ্য, নিরাপদ ওষুধ ব্যবহারের চর্চা, নাক-কান-গলার রোগ প্রতিরোধ, মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা এবং চোখের রোগের প্রাথমিক ব্যবস্থাপনা।
এই প্রশিক্ষণগুলোর গুরুত্ব রয়েছে প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসচেতনতা তৈরির ক্ষেত্রে। অনেক সময় গ্রামের মানুষ রোগের লক্ষণ সম্পর্কে জানেন না, কখন হাসপাতালে যেতে হবে তা বুঝতে পারেন না, কিংবা ওষুধ ব্যবহারের নিয়ম নিয়ে বিভ্রান্তিতে থাকেন। সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ পাওয়া তাঁদের সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করতে পারে।
কয়রার মানুষের জন্য মনোয়ার হোসেনের মতো কমিউনিটি পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবাদানকারীর উপস্থিতি কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা বুঝতে খুব বেশি দূর যেতে হয় না। প্রত্যন্ত এলাকার কোনো পরিবারে শিশু অসুস্থ হলে কিংবা কোনো প্রবীণ মানুষের শারীরিক সমস্যা দেখা দিলে পরিবারের সদস্যরা প্রথমেই খোঁজেন কাছাকাছি সাহায্য। সেই সাহায্য যদি দ্রুত পাওয়া যায়, তাহলে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করাও সহজ হতে পারে। আর প্রয়োজন হলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়াও জরুরি।
কিন্তু একজন মানুষের আন্তরিকতা দিয়ে একটি এলাকার সব স্বাস্থ্যসংকটের সমাধান সম্ভব নয়। কয়রায় প্রয়োজন পর্যাপ্ত চিকিৎসক, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা, সচল অ্যাম্বুলেন্স এবং দুর্গম এলাকার মানুষের জন্য সহজ যোগাযোগব্যবস্থা। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসাসুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রত্যন্ত জনপদে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়াও জরুরি। বিশেষ করে রাতের বেলায় অসুস্থ রোগীর চিকিৎসা পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকা দরকার।
মনোয়ার হোসেনের কাজের গল্প তাই একজন প্যারামেডিকের ব্যক্তিগত উদ্যোগের গল্প হওয়ার পাশাপাশি উপকূলীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার বাস্তবতাও তুলে ধরে। এখানে মানুষের প্রয়োজন শুধু ওষুধ কিংবা পরামর্শ নয়; প্রয়োজন এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা, যেখানে অসুস্থ হলে দূরত্ব, অর্থ কিংবা রাতের অন্ধকার চিকিৎসা পাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।
সুন্দরবনের পাশে বসবাস করা মানুষগুলো প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকেন। সেই জনপদে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মনোয়ার হোসেন তাঁর সামর্থ্য ও প্রশিক্ষণের পরিধির মধ্যে থেকে মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করছেন। তাঁর কাছে আসা মানুষের অভিজ্ঞতা সেই প্রচেষ্টার কথাই বলে।
মোহাম্মদ মনোয়ার হোসেন বলেন, “কয়রার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের স্বাস্থ্যসংকটের মধ্যে বসবাস করছেন। এখানে অনেক দরিদ্র মানুষ আছেন, যাঁদের পক্ষে দূরে গিয়ে চিকিৎসক দেখানো কিংবা চিকিৎসার ব্যয় বহন করা কঠিন। বিশেষ করে রাতের বেলায় কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে পরিবারের সদস্যদের দুশ্চিন্তার শেষ থাকে না। এসব মানুষের কষ্ট আমাকে নাড়া দেয়। আমি আমার সামর্থ্য ও প্রশিক্ষণের মধ্যে থেকে তাঁদের পাশে থাকার চেষ্টা করি। অনেক সময় সামান্য পরামর্শ কিংবা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমেও মানুষকে সহযোগিতা করা সম্ভব হয়। আমি চেষ্টা করি, কেউ যেন শুধু অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক পরামর্শ থেকে বঞ্চিত না হন। মানুষের মুখে স্বস্তি দেখতে পারা, তাঁদের উপকারে আসতে পারাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আমি চাই, কয়রার মানুষ যেন সহজে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পান। আমার একার পক্ষে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, তবে যত দিন পারি, মানুষের পাশে থেকে তাঁদের সেবা করে যেতে চাই।”
তবে কয়রার মানুষের প্রত্যাশা আরও বড়। তাঁরা চান, চিকিৎসার জন্য যেন আর দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে জেলা শহরে ছুটতে না হয়; রাতের বেলায় অসুস্থ হয়ে পড়লেও যেন চিকিৎসক পাওয়া যায়; অর্থের অভাবে যেন কোনো পরিবার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হয়।
সুন্দরবনঘেরা কয়রার এই জনপদে চিকিৎসাসেবার আলো আরও উজ্জ্বল করতে হলে মনোয়ার হোসেনের মতো স্থানীয় পর্যায়ের সেবাদানকারীদের ভূমিকার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থাকেও শক্তিশালী করতে হবে। কারণ, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আন্তরিকতা যেমন মূল্যবান, তেমনি প্রত্যেক মানুষের জন্য মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

আরো খবর দেখুন
© All rights reserved © 2018
Design By BDit.com.bd