বিদেশ : কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আর্কটিক অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে গতকাল মঙ্গলবার নতুন পরিকল্পনা প্রকাশ করতে যাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। অঞ্চলটিতে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে এ উদ্যোগ নিচ্ছে জোটটি। এএফপি’র হাতে আসা ইইউ’র নতুন ‘আর্কটিক কৌশল’-এর খসড়া অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল, বরফভাঙা জাহাজ ও সমুদ্রের তলদেশের যোগাযোগ কেবলের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে অঞ্চলটিতে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াতে চায় জোটটি। ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে আর্কটিক। ব্রাসেলস থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে। ইইউ’র আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ববিষয়ক প্রধান জোজেফ সিকেলা বলেন, ‘আর্কটিকের নতুন বাস্তবতায় ইউরোপকে শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার হতে হবে। আমাদের নতুন কৌশলের লক্ষ্য ঠিক এটাই।’ তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্রতা বৃদ্ধি থেকে শুরু করে নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ার মতো অঞ্চলের সবচেয়ে জরুরি চ্যালেঞ্জগুলো এতে তুলে ধরা হয়েছে। এসব পরিস্থিতিতে ইউরোপের কীভাবে সাড়া দেওয়া উচিত, তাও এতে নির্ধারণ করা হয়েছে।’ বৈশ্বিক উষ্ণায়নে সমুদ্রের বরফ গলে যাওয়ায় আর্কটিক অঞ্চলে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। রাশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ সেখানে তাদের তৎপরতা জোরদার করছে। প্রাকৃতিক সম্পদ ও নতুন সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ নিতে দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭ সদস্যের মধ্যে তিনটি দেশ- ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড ও সুইডেন- আর্কটিক অঞ্চলের দেশ। ফলে এ অঞ্চলে ইইউরও গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রয়েছে। এদিকে, ডেনমার্কের বিশাল স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া বারবার হুমকি ইউরোপকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। উত্তর মেরু অঞ্চলে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলির প্রভাব আরও দক্ষিণের এলাকাতেও পড়ে। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ইইউ’র প্রধান উরসুলা ভন ডার লিয়েন নতুন কৌশলটি উপস্থাপন করবেন। এর লক্ষ্য হলো অঞ্চলটি নিয়ে ইইউ’র সদস্যদেশগুলোর জন্য একটি অভিন্ন নীতিগত অবস্থান নির্ধারণ করা। এএফপির হাতে আসা খসড়ায় কানাডা, যুক্তরাজ্য ও নরওয়ের মতো ইইউ’র বাইরের ‘সমমনা’ দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এতে ‘উত্তরাঞ্চলীয় প্রতিবেশী’ অংশীদারদের নিয়ে নিয়মিত শীর্ষ সম্মেলনেরও প্রস্তাব রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কী হবে?
সম্প্রতি পর্যন্ত আর্কটিক অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে বিবেচিত যুক্তরাষ্ট্রকে সম্ভাব্য অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর তালিকায় রাখা হয়েছে। তবে নথিটির বাকি অংশে দেশটির অনুপস্থিতি বিশেষভাবে চোখে পড়ে। বছরের শুরু থেকে ট্রাম্পের বক্তব্যের সুর কিছুটা নরম হয়েছে। শেষ পর্যন্ত গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের সঙ্গে একটি নিরাপত্তা চুক্তিও স্বাক্ষর হয়েছে। তা সত্ত্বেও ইউরোপের অনেকেই এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। ২০ পৃষ্ঠার নথিটিতে যুক্তরাষ্ট্রের নাম মাত্র কয়েকবার উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, কানাডার নাম এসেছে প্রায় দুই ডজনবার। কৌশলটিতে এমন কয়েকটি উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে, যেগুলোর লক্ষ্য ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা কমানো বলে মনে হচ্ছে। খসড়া অনুযায়ী, গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মূল ভূখণ্ডের সংযোগ স্থাপনে একটি ‘সার্বভৌম ও নিরাপদ’ সাবমেরিন কেবল বসানোর পরিকল্পনা করছে ব্রাসেলস। বৃহত্তর ‘প্যান-আর্কটিক’ কেবল প্রকল্পের অংশ হিসেবে এটি স্থাপন করা হবে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে কানাডা, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকেও যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া ‘আইরিস’ নামের একটি স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক প্রকল্পের মাধ্যমে আর্কটিক অঞ্চলে স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ করছে জোটটি। ইলন মাস্কের স্টারলিংকের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে এ প্রকল্প গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে। আগ্রাসী রাশিয়াকে মোকাবিলার বিষয়টিও ইইউ’র অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। নথিতে ড্রোনের অনুপ্রবেশ ও সমুদ্রের তলদেশের কেবলে নাশকতার মতো প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে পরিচালিত হুমকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল পরিবহনকারী মস্কোর কথিত ‘ছায়া নৌবহর’-এর গতিবিধি পর্যবেক্ষণে তথ্য আদান-প্রদান বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে কৌশলটিতে।