সুমন আকন, সহকারী শিক্ষক,
২০৭ নং গাবগাছিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মোরেলগঞ্জ,বাগেরহাট
একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার মূল চালিকাশক্তি হলো তার শিক্ষা ব্যবস্থা। আর এই ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন শিক্ষক। একজন শিক্ষক যখন শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেন, তিনি কেবল নির্ধারিত পাঠ্যবইয়ের কিছু অধ্যায় বা পৃষ্ঠা শেষ করেন না; বরং তিনি একটি প্রজন্মের স্বপ্ন বুনে দেন, শিক্ষার্থীদের মনন, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলেন। আন্তর্জাতিক শিক্ষা মানদণ্ড ও আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞান বলে, শিক্ষকের প্রধান কাজ হলো আনন্দময় পাঠদান, শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি পূরণ, মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ তদারকি এবং নিজের পেশাগত দক্ষতার উন্নয়ন ঘটানো। একইভাবে, একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের ভূমিকা হওয়া উচিত একজন ‘একাডেমিক লিডার’ বা শিক্ষার দূরদর্শী নেতার মতো, যিনি পুরো বিদ্যালয়ের শিখন পরিবেশ তদারকি করবেন, সহকর্মীদের মেন্টরিং করবেন এবং যুগোপযোগী শিক্ষাদানের পথ দেখাবেন।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আমাদের দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন, রূঢ় এবং চরম উদ্বেগের। আজ একজন সহকারী শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষের চেয়ে বেশি সময় দিতে হচ্ছে অ-শিক্ষামূলক, ক্ল্যারিকাল ও আমলাতান্ত্রিক দাপ্তরিক কাজে। সকালের ঘণ্টা বাজার পর থেকেই শিক্ষকের কাঁধে চেপে বসে এক বিশাল অদৃশ্য কাগজের পাহাড়। কখনো মিড-ডে মিলের পুষ্টিকর বিস্কুট কিংবা ডিম, রুটি, কলা বিতরণের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব রাখতে হচ্ছে, কখনো উপবৃত্তির জটিল ডেটা এন্ট্রি ও সফটওয়্যার (PESP MIS) ব্যবস্থাপনায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে পার করতে হচ্ছে। উপবৃত্তির তথ্য হালনাগাদ করা, শিক্ষার্থীদের প্রোফাইল সচল বা নিষ্ক্রিয় করার মতো জটিল আইটি সংক্রান্ত কাজগুলো শিক্ষকদের নিজেদেরই করতে হয়, যার জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কারিগরি প্রশিক্ষণ তাঁদের দেওয়া হয়নি। এর বাইরেও রয়েছে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি জরিপ, ভোটার তালিকার তথ্য সংগ্রহ, স্বাস্থ্য বিভাগের কৃমি নিয়ন্ত্রণ বা টিকাদান কর্মসূচির ডাটা তৈরি এবং অন্তহীন প্রশাসনিক ফরম পূরণ।
অন্যদিকে, একজন প্রধান শিক্ষকের অবস্থাও আরও করুণ ও শৃঙ্খলিত। তিনি ব্যস্ত থাকেন শত রকমের প্রতিবেদন তৈরি, ফাইলের স্তূপ সামলানো, অডিট বা অডিটের নথিপত্র গোছানো, ক্যাশ বই মেলানো, টিআর-কাবিখার মতো উন্নয়ন কাজের তদারকি এবং বিভিন্ন দাপ্তরিক মিটিং নিয়ে। একজন প্রধান শিক্ষকের দিনের সিংহভাগ সময় কাটে টেবিলের ফাইল সই করতে করতে কিংবা ক্লাস্টারের সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার (এটেইও) অফিসে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তাড়াহুড়োয়। অথচ উন্নত বিশ্বে, এমনকি আমাদের পার্শ্ববর্তী অনেক দেশেও, এই ক্ল্যারিকাল বা কেরানির কাজগুলোর জন্য প্রতিটি বিদ্যালয়ে আলাদা দক্ষ প্রশাসনিক সহায়ক কর্মী বা আইটি অ্যাসিস্ট্যান্ট থাকে। আমাদের দেশে সেই ব্যবস্থা না থাকায়, একজন প্রধান শিক্ষক তাঁর মূল দায়িত্ব—অর্থাৎ শিক্ষাদান পদ্ধতি পর্যবেক্ষণ, শিক্ষকদের একাডেমিক সহায়তা দেওয়া এবং পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা করার সময়টুকুই পাচ্ছেন না।
এই ভ্রান্ত ও বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার চূড়ান্ত শিকার হচ্ছে আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। যে সময়টুকু একজন শিক্ষকের ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে কিংবা শিক্ষার্থীর টেবিলের পাশে বসে তার খাতা দেখায় কাটার কথা ছিল, সেই মূল্যবান সময় আজ অপচয় হচ্ছে অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্রের পেছনে। শিক্ষকরা প্রতিনিয়ত এক ধরনের তীব্র মানসিক ও দাপ্তরিক চাপে থাকছেন। ক্লাসে পড়ানোর মাঝখানেই হয়তো উপর মহলের জরুরি তাগিদ আসে—”বিকেলের মধ্যে অমুক তথ্য এক্সেল শিটে পাঠাতে হবে।” ফলশ্রুতিতে শিক্ষকের মনোযোগ ভেঙে যায়, পাঠদানের স্বতঃস্ফূর্ততা নষ্ট হয় এবং শ্রেণিকক্ষে এক ধরণের দায়সারা ভাব চলে আসে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান, যার দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পুরো জাতির মেরুদণ্ডে। আমরা জিপিএ-৫ বা শতভাগ পাসের পরিসংখ্যান দিয়ে হয়তো কাগজ-কলমে আত্মতৃপ্তি পাচ্ছি, কিন্তু বাস্তব জ্ঞান ও দক্ষতাসম্পন্ন প্রজন্ম গড়তে ব্যর্থ হচ্ছি।
আমরা যদি সত্যিই দেশের প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নত করতে চাই, তবে শুধু বড় বড় বাজেট, আধুনিক অবকাঠামো বা নতুন নতুন শিক্ষা কারিকুলামের পরিপত্র জারি করলেই হবে না; সবার আগে শিক্ষকের কাজের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষককে তাঁর মূল কাজ অর্থাৎ শ্রেণিকক্ষে সসম্মানে ফিরিয়ে দিতে হবে। প্রধান শিক্ষককে কাগজের ফাইলের বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে বিদ্যালয়ের একাডেমিক নেতৃত্বে সময় দেওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারকদের কাছে কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা তুলে ধরা হলো:
১. প্রশাসনিক জনবল নিয়োগ: প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অবিলম্বে অন্তত একজন করে স্থায়ী বা খণ্ডকালীন “অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর” নিয়োগ দেওয়া হোক, যিনি যাবতীয় অ-শিক্ষামূলক দাপ্তরিক ও ডাটা এন্ট্রির কাজ সামলাবেন।
২. অ-শিক্ষা কাজের চাপ কমানো: শিক্ষকদের শিক্ষা বহির্ভূত অন্যান্য সরকারি জরিপ বা মাঠপর্যায়ের কাজ থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হোক।
৩. ডিজিটালাইজেশনের সরলীকরণ: উপবৃত্তি বা অন্যান্য ডিজিটাল পোর্টালগুলোকে আরও ইউজার-ফ্রেন্ডলি করা হোক এবং এগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য উপজেলা পর্যায়ে আলাদা আইটি সেল গঠন করা হোক।
আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষা ব্যবস্থার প্রকৃত সংস্কার বা উন্নয়ন উপর মহল থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো কঠোর আদেশ দিয়ে সম্ভব নয়। এর প্রকৃত উন্নয়ন শুরু হয় তখনই, যখন একজন শিক্ষক পরম নিশ্চিন্তে, চাপমুক্ত মন নিয়ে পাঠদানে নিবেদিত থাকেন এবং একজন প্রধান শিক্ষক নির্ভয়ে শিক্ষার কার্যকর নেতৃত্বে মনোনিবেশ করতে পারেন। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে নীতি-নির্ধারকদের এই সত্যটি উপলব্ধি করতে হবে। দয়া করে শিক্ষককে কেরানি না বানিয়ে, শিক্ষকই থাকতে দিন। লেখক:-সুমন আকন, সহকারী শিক্ষক, ২০৭ নং গাবগাছিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মোরেলগঞ্জ,বাগেরহাট।