সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে ভারতের সাদা বলের সিরিজ আয়োজনের সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। দুই দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে ক্রিকেটীয় সম্পর্কেও। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) এক শীর্ষ কর্মকর্তাও সিরিজটি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে সিরিজ বাতিল না হওয়া পর্যন্ত আশা ধরে রাখতে চাইছে বিসিবি। বাংলাদেশে ভারতের সর্বশেষ সফর হয়েছিল ২০২২ সালের ডিসেম্বরে। এরপর আর বাংলাদেশ সফরে আসেনি ভারতীয় দল। আগামী সেপ্টেম্বরে সাদা বলের সিরিজ খেলতে ভারতীয় দলের বাংলাদেশ সফরের কথা রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সেই সফর এখন অনিশ্চয়তার মুখে। ক্রিকেটভিত্তিক ওয়েবসাইট ক্রিকবাজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিসিবির কর্মকর্তারা এখনো আশা করছেন আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি সেই আশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশেষ করে গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দলের কয়েকজন সদস্যকে ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন করার সুযোগ দেওয়ার পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, দিল্লিতে বসে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীকে এমন বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিয়ে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাওয়ার দাবি করতে পারে না। তার অভিযোগ, ওই বক্তব্য বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে। হাসিনার দিল্লির সংবাদ সম্মেলনকে ঘিরে দুই দেশের সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রভাব ক্রিকেটেও পড়তে পারে বলে মনে করছে বিসিবির একটি সূত্র। বিসিবির অভ্যন্তরীণ সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, ভারতকে আতিথেয়তা দেওয়ার সম্ভাবনার ক্ষেত্রে এই ঘটনাকে কার্যত ‘শেষ পেরেক’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিষয়টি বিসিবির জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে। কারণ, সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের পরও দুই দেশের ক্রিকেটীয় সম্পর্কের বরফ গলানোর ব্যাপারে বোর্ডের শীর্ষ কর্মকর্তারা আশাবাদী ছিলেন। বিশেষ করে চলতি বছরের শুরুতে নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশ আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানোর পর দুই দেশের ক্রিকেটীয় সম্পর্ক আরও চাপের মধ্যে পড়ে। বিসিবির বর্তমান সভাপতি তামিম ইকবাল বাংলাদেশে ভারতকে আতিথেয়তা দেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ভারতীয় দলের সফর নিশ্চিত করতে সরকারের সহযোগিতাও চেয়েছিলেন তিনি। ভারতকে আতিথেয়তা দেওয়া বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ডের জন্য কেবল ক্রিকেটীয় দিক থেকেই নয়, আর্থিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের বিশাল ব্র্যান্ড মূল্য এবং বিশ্বজুড়ে তাদের জনপ্রিয়তার কারণে ভারতীয় দলকে আতিথেয়তা দেওয়া যেকোনো ক্রিকেট বোর্ডের জন্যই বড় বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই সম্ভাবনাকে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া এবং পরবর্তী সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে ভারতের প্রতি বাংলাদেশের অসন্তোষ স্পষ্ট হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সেপ্টেম্বরে ভারত সফর হবে কি না, তা নিয়ে বিসিবির ভেতরেও সংশয় তৈরি হয়েছে। ক্রিকবাজের পক্ষ থেকে সেপ্টেম্বরে ভারতকে আতিথেয়তা দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বিসিবির এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সাম্প্রতিক সব ঘটনার পর এখন আমি সিরিজটি নিয়ে সন্দিহান।” সিরিজটি নিয়ে ভারতীয় পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়ার সম্ভাবনাও কম বলে মনে করছেন ওই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, “সিরিজের বিষয়ে অন্য পক্ষের কাছ থেকে আমরা কোনো সাড়া পাব বলে মনে হচ্ছে না। সত্যি বলতে, সিরিজটি হওয়ার কথা ছিল ২৮ আগস্টের মধ্যে। এখন আমাদের হাতে আর কত দিনই বা আছে?”সিরিজটি নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী হওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাইলে বিসিবির ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, “আমার তা মনে হয় না। ক্রিকেট বোর্ডের পক্ষ থেকে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। কিন্তু এই মুহূর্তে বিষয়টি আমাদের সবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে।” তবে আনুষ্ঠানিকভাবে সিরিজ বাতিল না হওয়া পর্যন্ত বিসিবি আশা ধরে রাখতে চায়। অর্থাৎ, রাজনৈতিক পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত বদলে গেলে ভারতীয় দলের বাংলাদেশ সফরের সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যাচ্ছে না। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেপ্টেম্বরের সিরিজ আয়োজনকে ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে বলেই মনে করা হচ্ছে। বাংলাদেশে ভারতের সর্বশেষ সফরের প্রায় চার বছর পর আবারও দুই দলের দ্বিপাক্ষিক সিরিজ আয়োজনের অপেক্ষা তৈরি হয়েছিল। রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে সেই অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হবে কি না, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।