• বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ০৪:৪১

যুদ্ধাপরাধ মামলার তদন্তের খবরে দুবলার চর থেকে পালিয়েছেন রাজাকার খোকন

প্রতিনিধি: / ৩০ দেখেছেন:
পাবলিশ: বৃহস্পতিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪

আবু-হানিফ,বাগেরহাট অফিসঃ খুলনার রূপসা উপজেলার দেয়ারা এলাকার বাসিন্দা খান শফিউল্লাহ খোকন (৭৩) ওরফে
‘রাজাকার খোকন’। চার দশকে হয়ে উঠেছেন পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের
দুবলার চরের মৎস্যপল্লীর অঘোষিত সম্রাট। প্রভাব আর আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে
নিরীহ জেলেদের শাসন ও শোষণের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অর্থবিত্তে
ফুলেফেঁপে উঠেছেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে দুবলার চরের সেই দাপুটে মৎস্য
ব্যবাসয়ীর দুই সপ্তাহ ধরে কোনো খোঁজ মিলছে না। আত্মগোপনে চলে গেছেন
তিনি । যুদ্ধাপরাধ মামলার তদন্ত শুরু হওয়ায় দুবলার চর ছেড়ে পালিয়েছেন কুখ্যাত
রাজাকার খোকন।
৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি রূপসা (সাবেক খুলনা) থানার দেয়ারা
এলাকার  রাজাকার কমান্ডার ছিলেন। দেশ স্বাধীনের পর পালিয়ে যান ভারতে। দুই বছর পর
আবার ফিরে আসেন দেশে। দেশ ফিরে স্বাভাবিক জীবনযাপন শুরু করেন।
পরবর্তীতে ৮৩-৮৪ সালের দিকে রাজাকার পরিচয় গোপন করে দুবলার চরের তৎকালীন
ফিশারম্যান গ্রæপের সভাপতি প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) জিয়া উদ্দিন
আহমেদের হাত ধরে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় শরণখোলা রেঞ্জের দুবলার চরে শুরু করেন
মৎস্য ব্যবসা। এর পর থেকেই আবার তার স্বরূপ উন্মোচিত হয়। শুরু করেন নিরীহ
জেলেদের নির্যাতন শাসন আর শোষন। সেই থেকে প্রায় চার দশক ধরে খান
শফিউল্লাহ খোকন ওরফে ‘রাজাকার খোকন’ দুবলার চরের মুকুটহীন স¤্রাট বনে
যান। হয়ে ওঠেন গোটা বঙ্গোপসাগর এবং সুন্দরবনের দুবলার চরের মৎস্যপল্লীর
নিয়ন্ত্রক। কিন্তু সেই দোরদÐ প্রতাপশালী খোকন রাজাকার হঠাৎ করে চলে গেছেন
আত্মগোপনে। গত দুই সপ্তাহ ধরে দুবলার চরে দেখা যাচ্ছে না কুখ্যাত এই
রাজাকারকে। তার মুঠোফোনও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
আত্মগোপনে যাওয়ার কারণ হিসেবে জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে রূপসা
এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা শামসুর রহমান ওরফে শ্যাম মল্লিককে হত্যা করেন খোকন
রাজাকার ও তার সহযোগীরা। সেই ঘটনায় খোকনসহ তার সহযোগীদের আসামী
করে ২০২২ সালে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন নিহতের ছেলে সাইদ মল্লিক।
গত ২৫ জানুয়ারি তদন্তকারী কর্মকর্তারা রূপসা থানায় এসে সাক্ষ্য গ্রহণ করেন।
মূলক তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া যুদ্ধাপরাধ মামলার তদন্ত শুরু হওয়ার পর পরই দুবলার চর
ছেড়ে পালিয়ে গেছেন খোকন রাজাকার।
এদিকে, খান শফিউল্লাহ খোকন ওরফে রাজাকার খোকন দুবলার চর ছেড়ে পালানোর
খবরে জেলে ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। দুবলার চরের জেলে-মহাজনরা
এতোদিন জিম্মি ছিলেনখোকন রাজাকারের কাছে। নিরীহ জেলে-ব্যবসায়ীরা
অনেকেই নির্যাতনের শিকার হয়েছের তার হাতে। যে কারণে খুশিতে চরে চরে
বএিছ আনন্দ-উল্লাস। নাম প্রকাশ না করার শতে দুবলার চর ও আলোরকোলের
একাধিক জেলে-মহাজন মুঠোফোনে এতথ্য জানিয়েছেন।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, খান সফিউল্লাহ খোকন ওরফে রাজাকার খোকন রূপসার
দেয়ারা গ্রামের খান শহিদুল্লার ছেলে। ছাত্রজীবনে ন্যাশনাল স্টুডেন্ট ফ্রন্টের
(এনএসএফ) সক্রিয়কর্মী ছিলেন তিনি। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে ১৯৬৮-
১৯৬৯ সালে খুলনার মুসলিম লীগের নেতা  খান এ সবুরে পেটোয়া বাহিনীর
প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন এই কুখ্যাত রাজাকার। দেশ স্বাধীনের পর পরই ভারতে পালিয়ে
যান। দুই বছর পরে আবার দেশে ফেরেনে। নিজ গ্রাম দেয়ারায় বসবাস শুরু করেন।
পরবর্তীতে খান শফিল্লাহ খোকন ওরফে খোকন রাজাকার ১৯৮৩ অথবা ৮৪ সালের
দিকে দুবলার ফিশারম্যান গ্রæপের তৎকালিন সভাপতি প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা
মেজর জিয়া উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে ব্যবসা শুরু করেন দুবলার চরে। কিন্তু তখন মেজর
জিয়াউদ্দিন জানতেন না যে, খোকন একজন রাজাকার। ২০১৭ সালে মেজর জিয়া
উদ্দিন মারা যাওয়ার পর তারই ছোট ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ
হন দুবলা ফিসারমেন গ্রæপের সভাপতি। আর সেই কমিটির সহ সভাপতি হন খান
শফিউল্লাহ খোকন ওরফে রাজাকার খোকন।
যুদ্ধাপরাধ মামলার বাদী সাইদ মল্লিক বৃহস্পতিবার (৮ ফেরুয়ারি) দুপুরে
মুঠোফোনে জানতে চাইলে বলেন, ভাদ্র মাসের ২৯ তারিখ রাতে খোকন রাজাকার
এবং তার সহযোগী আমজাদ ও নিয়ামত মুন্সী আমার আব্বাকে বাড়ি থেকে ধরে
নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। পরে ২০২২ সালে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে খোকন রাজাকার
ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করি। সেই মামলার তদন্ত শুরু হয়েছে।
মামলার আগে ও পরে রাজাকার খোকন এবং তার রোকজন আমাকে হত্যাসহ মামলায়
ফাঁসানোর হুমকি দিয়েছেন।
মামলার সাক্ষী মুনসুর আলী শেখ (৭২) মুঠোফোনে বলেন, রাজাকারের কমান্ডার
খোকন তার লোকজন আমার ভাই মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল শেখ ও শামসুর রহমান ওরফে
শ্যাম মল্লিককে বাড়ি ধরে নিয়ে যায়। তাদের দুজনকে গুলি করার পর শ্যাম মল্লিক
ঘটনাস্থইে মারা যান। পরে আমার ভাইকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে খুলনায় নিয়ে
চিকিৎসা করানোর পর বেঁচে যান।
সাক্ষী মুনসুর শেখ মুঠোফোনে আরো বলেন, ১৯৭১ সালে খোকন রাজাকারের
নেতৃত্বে শোলপুর, দেয়ারা ও যুগীহাটি গ্রামে হিন্দুদের বাড়িঘরে
অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ, লুটপাট, হত্যার ঘটনা ঘটেছে।
বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ খুলনা জেলা ইউনিটের কমান্ডের কমান্ডার মো.
মাহাবুবার রহমান বলেন, খান মফিউল্লাহ খোকন একজন তালিভুক্ত রাজাকার। বাবার
নাম অস্পষ্ট থাকায় প্রথম দিকে তার নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ে। পরবর্তীতে
সংসদীয় কমিটি থেকে তালিকা চাওয়া হলে বাবার নাম সনাক্ত করে খোকনকে
রাজাকারের তালিকাভুক্ত করা হয়। ৭১ সালে তার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন, হত্যা,
লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে।
এব্যাপারে কথা বলার জন্য খান শফিউল্লাহ খোকন ওরফে খোকন রাজাকারের
মুঠোফোনে কল করা হলে তার নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।


এই বিভাগের আরো খবর
https://www.kaabait.com