• রবিবার, ২১ জুলাই ২০২৪, ১২:৫১

মোরেলগঞ্জের উন্নয়নে চাহিদাভিত্তিক খাত, বরাদ্দ  ও বাজেট বাস্তবায়নে নানা প্রতিবন্ধকতা 

প্রতিনিধি: / ৪৪ দেখেছেন:
পাবলিশ: সোমবার, ২৪ জুন, ২০২৪

মেজবাহ ফাহাদ -মোরেলগঞ্জ:  বাংলাদেশের দক্ষিনপশ্চিম অঞ্চলের  একটি বৃহৎ  উপকূলীয় উপজেলা বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ। সিডর,আইলা এবং রেমাল বিদ্ধস্থ এই উপজেলা ১৬ টি ইউনিয়ন ও ১ টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত যার আয়তন ৪৩৭ বর্গমাইল। দেশের ৩ৃয় বৃহত্তম এই উপজেলার মানুষ প্রতিনিয়ত জোয়ার,ভাটার সাথে যুদ্ধ করে জীবন-জাপন করছেন। ঘুর্নীঝড় দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির  প্রশ্ন এলেই দেশে  সমুদ্র উপকূলীয় যে উপজেলাটির নাম সামনে আসে সেটা এই মোরেলগঞ্জ। এই উপজেলার মানুষ প্রতিনিয়ত প্রাকৃিতিক দুর্যোগ ও লবন পানি মোকাবিলা করে জীবন পরিচালনা করছে।

ক্রমাগতভাবে এই উপজেলায় প্রতিবছর বাজেটের আকার ফুলেফেঁপে উঠলেও নদীতীরবর্তী গ্রামের সাধারণ মানুষ সুষম স্হানীয়  উন্নয়নে সঠিক বাজেট বাস্তবায়নে বিভাজন রয়েছ। বাস্তবভিত্তিক  পরিকল্পনায় খাত ভিত্তিক বাজেট সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে দেখা যায় না। এর ফলে এই অঞ্চলের দারিদ্র্যহার দিন দিন বৃদ্ধি পায়। বলা যেতে পারে আর্থ সামাজিক উন্নয়নে এই উপজেলার মানুষ এখনো পিছিয়ে রয়েছে। জেন্ডারভিত্তিক, সংবেদনশীল  বাজেট প্রনয়ণ ও বাস্তবায়ন হলে পিছিয়ে পড়া এই  অঞ্চলগুলোতে এর প্রতিফলন দেখা যেতে পারে।

সরেজমিনে মোরেলগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, অসহায়,হতদরিদ্র,ছিন্নমুল মানুষের জীবন দুর্বিসহ, মুলত এই উপজেলার মানুষের আয়ের প্রধান উৎস হচ্ছে কৃষি ও মৎস চাষ,আর সেই কৃষি ও মৎস খাতে চাহিদাভিত্তিক বাজেট প্রনয়ণ এবং তা বাস্তবায়ন  দেখা যাচ্ছে না।

গত কয়েকদিন আগে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ডরপ এর ইভলপ প্রজেক্টের সমন্বয়ে  জেন্ডারবান্ধব,জলবায়ু সংবেদনশীল,চাহিদাভিত্তিক খাত তৈরি সহ বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে স্হানীয় গণমাধ্যম কর্মী,ইউপি সচিব,ইউপি সদস্য ও সুশীল সমাজের ব্যক্তিদের নিয়ে  সেমিনার হয়েছে।

উপজেলার বারইখালী ইউনিয়নে গ্রামীণ জনপদে হাঁটতে হাঁটতে কথা হচ্ছিল দিনমজুর রুহুল আমীনের সাথে,তার জীবন সংগ্রামের কয়েকটি কথা এই প্রতিবেদকের কাছে অশ্রুসিক্ত নয়নে তুলে ধরলেন,তার মতে তিনি সরকারের তেমন কোন সুযোগ,সুবিধা পান না,বছরে দু-এক বার ভিজিএফ চাল ছাড়া কিছুই জোটে না তার কপালে,ইউনিয়ন পরিষদের সরকারি কি সহায়তা আসে কি ইউপি সদস্য কিছুই জানায় না,দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে কাজ করেন,তবে তিনি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ওয়াল্ড ভিশন দিয়ে একটি গাভী পেয়েছেন তার স্ত্রী সেটা লালন-পালন করছেন,ডরপ নামের একটি এনজিও এলাকায় পানির ফিল্টার করে দিয়েছে,তারা আমাদের বিশুদ্ধ পানি পান করার ব্যবস্হা করে দিয়েছে। তার আক্ষেপ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তো অসহায় মানুষের জন্য অনেক সহায়তার বাজেট দেন,সেগুলো ইউনিয়ন পরিষদ সঠিক ভাবে কেন বল্টন করেন না।রুহুল আমিন আরো বলেন গতবছর বারইখালী ইউনিয়ন পরিষদে ডরপ ইভলপ প্রজেক্টের  একটি গনশুনানিতে গেছিলাম,সেখানে আমাগো মতো অসহায় মানুষের জন্য অনেক আলোচনা হইছে।

পানগুছি নদীর দুপাশ ঘেষা,সুন্দরবনের পাদদেশে কোস্টাল এলাকা বাগেরহাটের এই মোরেলগঞ্জের কয়েকটি ইউনিয়নের বাজেট  সুষম আঞ্চলিক উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। এই এলাকার সাধারণ মানুষ ও গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী,সংবেদনশীল করতে সংলাপ সহ সরকারী,বেসরকারি সংস্হার এগিয়ে আসতে হবে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় খুজতে হবে।

দেশের অবহেলিত জনপদ এই মোরেলগঞ্জে আঞ্চলিক উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হলেও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জোড়ালো কোন পদক্ষেপ নেই,বিশেষ করে কয়েকটি ইউনিয়নে যেমন-খাওলিয়া,বহরবুনিয়া,বারইখালী,পঞ্চকরন,পুটিখালি,বলইবুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের  সমসাময়িক বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিগুলোতে (এডিপি) এর প্রতিফলন ঘটেনি। মোরেলগঞ্জে সরকারের দায়িত্বে থাকা আমলাদের  নারী-পুরুষ জেন্ডারভিত্তিক বাজেট বাস্তবায়নে সহায়ক ভূমিকা রাখতে হবে।

গত কয়েকদিন ধরে মোরেলগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের পথে প্রান্তরে ঘুরে  একজন সংবাদকর্মী হিসেবে কয়েকটি বিষয় সামনে নিয়ে এসেছি সেগুলো হলো ঃ

ক. মোরেলগঞ্জের অবহেলিত  গ্রামীণ জনপদে জলবায়ু সংবেদনশীল  জেন্ডারভিত্তিক বাজেট প্রনয়ণ এবং গ্রামীণ  উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনকালে  গ্রামীণ জনপদের সার্বিক বৈষম্য হ্রাসে অবদান রাখবে এমন প্রকল্পকে অগ্রাধিকার প্রদান করা।

খ.পিছিয়ে থাকা এই মোরেলগঞ্জ উপজেলায়  অবকাঠামো উন্নয়নের বিশেষ প্রকল্প গ্রহন

গ.কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য পিছিয়ে পড়া ইউনিয়নের অসহায় মানুষের জন্য জনমুখু,কল্যানকর,সম্প্রসারিত বাজেট প্রনয়ণ করা

ঘ. গ্রামীণ  উদ্যোক্তাদের সরকারের এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা থেকে বিশেষ আর্থিক সুবিধা প্রদান করতে হবে

ঙ.সিডর,আইলা, রেমাল বিদ্ধস্থ মোরেলগঞ্জের কৃষি এবং গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে এমন কার‌্যাবলি সম্প্রসারণ করা যেতে পারে

চ.পিছিয়ে থাকা মোরেলগঞ্জের মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সামাজিক সুরক্ষায় অধিক গুরুত্ব প্রদানের নীতি গ্রহণ করা যেতে পারে

ছ.সবশেষ প্রশ্নটি উঠে এসেছে তা হলো গ্রামীণ বাজেটে মোরেলগঞ্জ সমভাবে লাভবান হয়েছে কিনা ?  বলা হয়, কেন্দ্রচ্যুতি বনাম সমকেন্দ্রিকতার বিশ্লেষণ থেকে ধারণা পাওয়া যায়, দীর্ঘ সময় ধরে এ উপজেলায় বৈষম্য বেড়েছে। এই বৈষম্য দুরিকরনে সরকারি, বেসরকারি সংস্থাগুলোর এগিয়ে আসতে হবে।

উপরের আলোচনার আলোকে বলতে চাই, মোরেলগঞ্জের গ্রামীণ জনপদে জেন্ডারভিত্তিক বৈষম্য হ্রাসে কেবলমাত্র বাজেট বা বরাদ্দ বাড়িয়েই কোনো খাতের পরিবর্তন সম্ভব নয়, যদি না সে বরাদ্দের গুণগত ব্যবহার করা হয়। অতীতে দেখা যায়, বরাদ্দ যাই থাকুক না কেনো তার পুরোপরি খরচ করা যায় না। বছর শেষে জুন মাসে খরচের ব্যাপক তাড়া এ প্রথা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

মোরেলগঞ্জে আগামী ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রতিটি ইউনিয়নে বিশাল ও উচ্চাভিলাষী মোট  বাজেটের উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন ব্যয়ের কমপক্ষে ৩৫ শতাংশ যদি আগামী ছয় মাসে সঠিক অর্থে ও মানসম্মতভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে সামগ্রিক চাহিদা বৃদ্ধি, অবকাঠামো ঘাটতি হ্রাস এবং দরিদ্রবান্ধব, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা বিধানমূলক ব্যয় ইত্যাদির মাধ্যমে প্রস্তাবিত বাজেট সার্বিক মোরেলগঞ্জের জনকল্যাণে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছি।


এই বিভাগের আরো খবর
https://www.kaabait.com