মো. শহীদুল্লাহ পাটোয়ারী
ইসলাম আল্লাহর দেয়া একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। এর মধ্যে কোনো খুঁত নেই, ত্রæটি নেই, ফাঁক নেই। সুন্দর জীবনের জন্য ইসলামিক বিধিবিধানগুলো মেনে চলা উচিত। আজ আমাদের সমাজে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যাই হবে ৪ কোটিরও অধিক। এরা কাজের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কাজের সংস্থান করতে পারছে না। সে জন্য সামাজিক একটি অস্থিরতা সমাজে বিরাজ করছে ও নানাবিধ সামাজিক অবক্ষয় সৃষ্টি হতে চলেছে। যার আছে তার অভাব নেই, যার নেই সে জঠর জ্বালায় অস্থির। জঠর জ্বালায় অস্থির মানুষ হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে যায়। অভাবের দহনে দগ্ধ হয়ে ন্যায়-অন্যায় বিস্মৃত আদম সন্তান পাপের পঙ্কিলে নিমজ্জিত হয়। নারী তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ পর্যন্ত বিসর্জন দিতে দ্বিধাবোধ করে না। ুধার তাড়নায় বাঘ যেমন আপন সন্তান পর্যন্ত ভক্ষণ করে। দারিদ্র্যের কষাঘাতে নিমজ্জিত মানুষ বিবেকহারা হয়ে নিজের অজ্ঞাতসারেই আÍধ্বংসী পথে অগ্রসর হয়। তাই প্রিয় নবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) বলেছেন দারিদ্র্য মানুষকে কুফরের পথে টেনে নিয়ে যায়। যা মানুষকে কুফরের পথে ঠেলে দিতে পারে তা কখনো ইসলামসম্মত হতে পারে নাÑ সে জন্য ইসলাম হালাল রুজিকে ইবাদতের সমান গণ্য করেছে : কাছরুল হালালে ইবাদাতুন আপন ছেলে সন্তান ও পরিবার-পরিজনের লেখাপড়া ভরণ-পোষণের দাবিতে পালন করা কঠিন ইবাদততুল্য। এ ক্ষেত্রে দায়িত্বে অবহেলা অমার্জনীয় অপরাধ।
যারা সমাজে বিত্তবান তাদের উচিত মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করা। আমাদের সমাজে ইসলামের বিধিবিধান মতো এখনো সম্পদের সুষম বণ্টন হচ্ছে না বিধায় একশ্রেণী রাতারাতি কালোটাকার পাহাড় গড়ে তুলেছে অন্যদিকে বেকারের আহাজারিতে আকাশ ভারি হয়ে উঠেছেÑ কাজ নেই, কাজ নেই! এখন কথা হলো, যদি বিত্তবানরা অন্যের জন্য কাজের সংস্থান করে না দেয়, তাহলে কি মানুষ বাসে থাকবে? সামান্য পুঁজি দিয়েও অনেক কাজ শুরু এবং প্রয়োজনে যৌথভাবে যুবকরা মিলেও কাজ করতে পরে। আজকাল কৃষিখাতের পণ্যের বিরাট চাহিদা বিশ্বজুড়ে আর বাংলাদেশের মাটি হলো সোনার চেয়েও খাঁটি। এখানে একটি গাছের চারা রোপণ করে দিলে মনের অজান্তেই ১০ বছর পর সে চারাটি ২৫ হাজার টাকার বৃক্ষে পরিণত হয়ে যায়। যার জন্য কোনোরকম শ্রম দিতে হয়নি। অন্যদিকে আফ্রিকা ও আরব দেশের বালুভ‚মিতে একটি গাছের চারা বাঁচাতে হাজার হাজার টাকা খরচ করেও সম্ভব হয় না।
মহান রাব্বুল আলামিন স্বীয় পরিশ্রমে অর্জিত সম্পদের সাহায্যে জীবিকা নির্বাহ করতে তার দৈহিক কাঠামোকে মজবুত করতে এবং আল্লাহর ইবাদতের জন্য তাকে পবিত্র করতে বলেছেন। যে ব্যক্তি নিজের শ্রমে দৈহিক প্রয়োজন পূর্ণ করতে আগ্রহী নয়, সে আল্লাহর নির্দেশ অমান্যকারী অভিশপ্তদের তালিকাভুক্ত হয়ে যায়। কারণ পেটে ুধা থাকলে কোনো কাজেই শান্তি আসে না। যে পরিশ্রমী, অর্থ উপার্জন করে সে তার ইচ্ছামতো খাদ্য গ্রহণ করতে পারে। যে অন্যের আশায় থাকে তার ভাগ্যে কখন জুটবে বা জুটবে না, তা সে নিশ্চিত বলতে পারে না। সুতারাং হাত-পা যার আছে তার ভিক্ষার আশায় বসে থাকা উচিত নয়Ñ ইসলাম ভিক্ষাবৃত্তিকে নিরুৎসাহিত করে কর্মের প্রতি উৎসাহী হওয়ার আহŸান জানিয়েছে। আল্লাহকে সেজদা করার আগেই ুধা নিবৃত্তির নির্দেশ দিয়েছেন।
দারিদ্র্য একটি অভিশাপ : সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, এ দেশে পথশিশুর সংখ্যা ৬ লাখ বা তারও অধিক। এসব শিশু অনাদরে অযতেœ বেড়ে উঠছে। বিভিন্ন স্বার্থানে¦ষী মহল এসব শিশুকে কুড়িয়ে নিয়ে সন্ত্রাসমূলক কাজে লাগায়, আÍঘাতী কাজে লাগায়। এ শিশুরাই একদিন তাদের স্বার্থ হাসিলের পথে সহায়ক ভ‚মিকা রাখতে বাধ্য হয়Ñ সেজন্য এসবের প্রতি লক্ষ্য করা একদিকে যেমন সরকারের দায়িত্ব, অন্যদিকে সমাজে যারা বিত্তবান, সুখে-শান্তিতে থাকতে চায় তাদেরও দেখা উচিত। সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন এরাই তাদের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে যাবে। যারা আল্লাহর নির্দেশিত পথ থেকে বিচ্যুত হয় তাদের মহান আল্লাহ এই জগতেই দারিদ্র্য এবং অন্নাভাব দ্বারা লাঞ্ছিত করেন পরকালেও তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তির বিধান। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি আমার উপদেশ থেকে পরন্মুখ হবে তার জীবনযাত্রা হবে অভাবময়, আর শেষ বিচারের দিনে সে উত্থিত হবে অন্ধ অবস্থায়। সুরা : তাহা, আয়াত : ১২৪।
পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন প্রত্যেক মানুষকে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। দিন-রাত শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে ইবাদত-বন্দেগি করার নাম ইসলামী জীবন বিধান নয়। নিজের জন্য, নিজের পরিবারের জন্য উৎপাদন ও কল্যাণমুখী কাজ করার প্রতি ইসলাম অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। প্রিয় নবীর (সা.) সময়ের একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। একজন সাহাবি দিন-রাত মসজিদে ইবাদতে মশগুল থাকার কথা জানালে রাসুল (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন তাহলে তার খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা কে করে? জবাবে তিনি বলেছিলেন তার ভাই। তখন রাসুল (সা.) বলেছিলেন তাহলে সে-ই তো তোমার অপেক্ষা উত্তম ব্যক্তি। তাই ইসলাম কেবলমাত্র আনুষ্ঠানিক ইবাদত-বন্দেগির নাম নয়, প্রত্যেক ব্যক্তি তা নিজস্ব প্রয়োজন পূরণের জন্য কঠোর পরিশ্রম করবে এবং সুনির্দিষ্ট সময়ে ইবাদত করবেÑ ইসলাম এমন জীবনকেই উৎসাহিত করে। দারিদ্র্য মানুষকে কুফরে পরিণত করে সেজন্য তিনি রাসুল (সা.) দারিদ্র্য থেকে পানাহ চাইতেন অন্যদিকে ভিক্ষাবৃত্তিকে তিনি নিরুৎসাহিত করেছেন। সক্ষম ব্যক্তিদের জন্য ভিক্ষাবৃত্তি হারাম করে দিয়েছেন। সবাইকে পরিশ্রম করে উপার্জনের পথের নির্দেশ দিয়েছেন। ১হাতে-কলমে শিখিয়ে গেছেনÑ তবে কেউ যদি ভিক্ষা চায় তাহলে তাকে কিছু না দিয়ে শুধু ভর্ৎসনা করে বিদায় দিতেও নিষেধ করেছেন। বস্তুত একজন মুসলমান খাওয়া-পড়ার জন্য বাঁচে না, বাঁচার জন্য খায় ও পরে। বাঁচার জন্য শুধু খাওয়াই যথেষ্ট নয়, সেই সঙ্গে তার রক্ষণাবেক্ষণ সামাজিক নিরাপত্তা ও আÍসম্মানবোধ নিয়েই মানুষ বাঁচতে চায়, সেজন্য প্রত্যেককে প্রত্যেকের দায়িত্ব পালন করা বাঞ্ছনীয়।
রাসুল (সা.) বলেছেনÑ যে অভাবে নিমজ্জিত, সে মানুষের কাছে তা প্রকাশ করলে তার অভাব দূর হবে না কাজ করতে হবে এবং আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে হবে।
সদগা বা সাহায্যনির্ভর জীবন ও জাতি : বিদেশি সাহায্য বা সদগার ওপর কোনো জাতি সম্মানজনকভাবে জীবনযাপন করতে পারে না। বেঁচে থাকতে পারে না, কারণ সাহায্যদাতার কথা সাহায্য গ্রহণকারীকে শুনতে ও মানতে হয়। সারাবিশ্বে বর্তমান বাজারমুখী অর্থনীতির যুগে বিদেশি সাহায্যের জন্য আমাদের দেশ তাকিয়ে থাকে অন্যদিকে আমাদের দেশে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির চিত্র বিগত কেয়ারটেকার সরকার আমলে আমরা দেখেছি। যদি এসব দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব হতোÑ তাহলে বিদেশি সাহায্য আমাদের প্রয়োজন হতো না। বর্তমান সময়ে এইডস একটি জীবন ধ্বংসকারী মহামারির নাম। তাই নিজ পায়ে দাঁড়াতে হলে আমাদের সম্পদের সুসম বণ্টন এবং দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে হবে।
সরকারের প্রতিটি কর্মকর্তা ও কর্মচারী বা তাদের চেয়ার এক-একটি বিচারকের চেয়ার হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে। তারা যদি জনগণের কাছ থেকে ঘুষ খায় তা হলে এ জাতির ভাগ্যে আরো কিছু কষ্ট আছে ধরে নিতে হবে। অথচ ঘুষ ছাড়া একটি কাগজও চলে না। চাকরি ক্ষেত্রেও ঘুষ। যে ঘুষ দিয়ে চাকরি নেয় সে কীভাবে সৎ হবেÑ সুন্দর জীবন গড়ার জন্য নতুনভাবে শুরু করতে হবে। দান-সদগা জাকাত ইত্যাদি হলো মানুষের পাপ ধোয়া ময়লা ধনীদের কাছ থেকে সদগা গ্রহণ করে তাদের পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র করার জন্য মহান আল্লাহ তার রাসুলকে (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন। তুমি তাদের ধন-সম্পত্তি থেকে সদগা আদায় কর এবং তা দ্বারা তুমি তাদের পবিত্র ও পরিুদ্ধ কর। সুরা : তাওবা, আয়াত : ১০৩।
সদগার টাকা স্বাস্থ্যবান ও সুস্থ লোকের জন্য হালাল নয়, রাসুল (সা.) বলেছেন নিশ্চয়ই এসব সদগা লোকের ময়লা ও আবর্জনা। নিশ্চয়ই এটা মোহাম্মদ (সা.) ও তার বংশধরদের জন্য হালাল নয়Ñ মুসলিম শরিফ। রাসুল (সা.) মাঝে মধ্যে যে দান গ্রহণ করতেন তা হলো জাকাত। জাকাত হলো মালের ওপর নির্ধারিত ট্যাক্স। আমাদের সুন্দর সমাজব্যবস্থার জন্য আমরা পবিত্র কোরআনের আলোকে জীবন গড়ে তুলতে সচেষ্ট হলে কোনোরূপ অভাব আমাদের দেশে থাকতে পারে না।
কারণ এ দেশের যে জনসম্পদ আছে তাকে যদি প্রয়োজনীয় শিক্ষা বা ট্রেনিং দিয়ে সরকারি খরচে বিদেশ পাঠানো হতো তাহলে বিদেশি কোনো সাহায্যই আমাদের আর দরকার হতো না। বর্তমানে বিদেশে কর্মরতদের যে রেমিটেন্স দেশে আসে তার দ্বারা আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রির্জাভ সর্বকালের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। সরকার বিদেশে যোগ্যলোক প্রেরণের নামে একটি প্রজেক্ট তৈরি করে যারা এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত তাদের ইমানের সঙ্গে বেতনভাতা দিয়ে পরিচালক নিযুক্ত করতে পারে। কিন্তু সরকারের উদ্যোগ বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য নয় বলেই আমরা জাতি হিসেবে অনেক পিছিয়ে রয়েছি। বিশ্বে ব্যাংক সুদের হার আর বাংলাদেশের ব্যাংক সুদের হারের মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। সরকার যদি বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শুধু ব্যাংক সুদের হার সঠিক বেঁধে দিত, তাহলে এ দেশে একটি ছেলেও বেকার থাকত না কারণ এ দেশে শিক্ষাবিপ্লব গড়ে উঠত, কোটি কোটি লোকের কর্মসংস্থান সঠিক হতো, সর্বোপরি কৃষিপণ্য বিশ্বে রফতানি করে শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা কর্মের সংস্থান করে নিতে পারত।
সরকারের উচিত সুষ্ঠু পরিকল্পনা তৈরি করে দেয়াÑ কাজ তো করবে জনগণ। বাজারমুখী অর্থনীতির যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা বিদেশিরা ভোগ করছে। বাংলাদেশ বিশ্বের বাজারে পরিণত হয়েছে আর আমরা শুধু উচ্চ হারের ব্যাংকসুদ ব্যবস্থার কারণে বিশ্ব বাজারে প্রতিযোগিতা করতে যেতেই পারছি না। সেজন্য একমাত্র ব্যাংক সুদের উচ্চ হারই দায়ী। এ দেশে বিদেশ থেকে আনা ডিমের টাকা ও এনজিওগুলো ৩৬ শতাংশ সুদে লগ্নি করে গরিবের শেষ রক্তবিন্দুও তারা চুষে নিচ্ছেÑ এসব দেখার কি কেউ এ দেশে নেই?
https://www.kaabait.com