• বুধবার, ২৪ জুলাই ২০২৪, ১১:৫৬

গল্প; মা

প্রতিনিধি: / ১০ দেখেছেন:
পাবলিশ: মঙ্গলবার, ২ জুলাই, ২০২৪

আলোরানি

সারা বাড়ি জুড়ে আজ অন্ধকার নেমে এসেছে। তবে অন্ধকারটা শুধু ক্ষণিকের জন্য নয়, হয়তো এটা দীর্ঘস্থায়ী। হ্যাঁ প্রিয়ার জীবনে সত্যিই এটা দীর্ঘস্থায়ী।।
প্রিয়া সেই সকাল থেকে বই নিয়ে বসে আছে। সামনে তার বড় পরীক্ষা। কথা দিয়েছে তার মা কে, সে তার লক্ষ্য পূরণ করবেই।
তবে কমলা দেবী কোনোদিনও, মেয়ের ওপর কোনো বিষয়ে জোর করে নিজ সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেননি। মা মেয়ের মধ্যেকার সম্পর্কটা তাই বেশ সুমধুর। পেশায় একজন ব্যবসায়ী কমলা দেবী। প্রতিদিন ভোর বেলা উঠে সাক – সবজি কিনতে বড়ো হাটে যান। সেই সবজি এনে বিক্রি করেন গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে। শত কষ্ট সহ্য করেও তার একমাত্র শান্তির উৎস মেয়ের মুখের হাসি। তাই সেই হাসি ফোটাতে, তিনি জীবন পণ করে খেটে যান দিন রাত।
প্রিয়ার কাছেও, তার মা মানেই তার পৃথিবী। তাই মায়ের যতটা সম্ভব খেয়াল সে রাখে। কিন্তু তার মনে বারেবারে একটাই প্রশ্ন নাড়া দেয় ” তার মাকেই কেন সব দিক সামলাতে হয় – তার বাবা কই !” এই প্রশ্ন সে দীর্ঘ ১২ বছর ধরে করে আসছে তার মাকে, কিন্তু তার মা কখনোই তাকে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না। প্রশ্নটা করা মাত্রই কেমন যেন উদাসীনতার প্রলেপ তার মুখে ফুটে উঠে। তাই প্রিয়া বারেবারে থেমে যায়। তার মনে একটাই বিশ্বাস, একদিন সে ঠিক তার বাবাকে খুঁজে বের করবে।
তবে দিন যত বাড়তে থাকে প্রিয়ার মনে সন্দেহও তত বাড়তে থাকে আর মায়ের প্রতি আগ্রহ কমতে থাকে। তাই সে ঠিক করেই ফেলে, একবার বাড়ির বাইরে বেরোতে পারলে, সে তার বাবার খোঁজ নিয়েই ছাড়বে। তাই তার মা বাজারে যাওয়ার পর, সে তার মায়ের যতœ করে তুলে রাখা টিনের বাক্স টা খুলে, ভালো করে খুঁজে দেখে, আর সেখান থেকে আবিষ্কার ও করে একটা পুরনো চিঠি, সাথে একটা উইপোকা খাওয়া অর্ধেক ছবি। সেই চিঠি তে দেওয়া ঠিকানায় পৌঁছানো হয়ে ওঠে তার জীবনের মূল লক্ষ্য। পরীক্ষার প্রস্তুতি ছেড়ে এই ঠিকানা পৌঁছানোর ব্যবস্থায় সে মন দেয়। তাই শেষমেশ তার মা কে মিথ্যে পরীক্ষার অজুহাত দিয়ে, একা একাই পাড়ি দেয় সেই ঠিকানায়।
এদিকে প্রখর রৌদ্রে চ্যাটচ্যাটে গরমে একদিন দুপুর বেলা কমলা দেবী, বাড়ি বাড়ি ঘুরে সবজি বিক্রি করছিলেন। হঠাৎ করে বাড়ি ফেরার সময় মাথা ঘুরিয়ে রাস্তার মাঝেই লুটিয়ে পড়েন। গ্রীষ্মের ওই দুপুরে জনহীন রাস্তার মাঝে পড়ে থাকেন টানা দুই ঘণ্টা। যখন তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন জীবন নামক সময়ের ঘড়ির কাটা থেমে যায়।
গ্রামের লোক প্রিয়ার খোঁজ করে সৎকার এর সময়। কিন্তু মেয়েটিকে কোথাও পাওয়া যায় না। পাশের বাড়ির এক কাকিমা বলে, সে পরীক্ষা দিতে দূর রাজ্যে পাড়ি দিয়েছে। কখন ফিরবে তার মা ছাড়া কেউই জানত না। তাই তার কোনো খবর না পেয়ে, কমলা দেবীর শেষ কাজ টুকু গ্রামের মানুষরাই সম্পন্ন করে।
এক সপ্তাহ পর প্রিয়া যখন বাড়ি ফেরে, তখন চারদিক খা খা করছে। মা মা করে ডেকে সারা বাড়ি মাথায় করলেও, মায়ের ডাক আর সে শুনতে পায় না। প্রতিবেশী সেই কাকিমা তার চিৎকার শুনে ছুট্টে আসে, ধীর গলায় তাকে শান্ত করে, সবটা খুলে বলে।
বিনা মেঘে বজ্রপাত পড়ার মতো অবস্থা হয় প্রিয়ার। দিশেহারা হয়ে মা মা করে কাঁদতে কাঁদতে নিঃস্তব্ধ হয়ে যায়। বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে থাকে ওই বাড়িটায়। বারবার চিৎকার করে বলার চেষ্টা করে ” মা আমি যার খোঁজ করতে গিয়ে তোমায় হারালাম, আসলে সেই মানুষটা তো তুমিই। অত বড়বাড়ির মেয়ে হয়েও ফুটপাতে পড়ে থাকা একটা সদ্যজাত এর জন্য তুমি সব সুখ বিলাসিতা ছেড়ে এই গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিলে।
একটি বার ও জানতে দাওনি, আমি আসলে কে! নিজের পরিবার ভালোবাসা সব কিছু ছেড়ে আমার নিয়ে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছিলে। স্বার্থপর এই পৃথিবীতে একটা রাস্তার শিশুর জন্য নিজের সমস্ত জীবন উৎসর্গ করতেও একবারও ভাবো নি। এতটা স্বার্থত্যাগী কেন হলে মা! আমি সত্যিই কোনোদিন আর নিজেকে ক্ষমা করতে পারবো না কারণ,
আমি হাতের কাছে মুক্তো পেয়েও তার কদর করতে পারিনি। মা নামের একটা পৃথিবী থাকা সত্বেও অন্য পৃথিবীর খোঁজে হন্যে হয়ে পাড়ি দিয়েছি, আর শেষমেশ সেই পথেই নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি। পারলে আবার ফিরে এসো অন্য কোনো রূপে। তোমার এই মেয়ে থাকবে তোমার অপেক্ষায়।
এরপর দীর্ঘ কুড়ি বছর কেটে গেছে, প্রিয়া এখন শহরের বিখ্যাত একজন ব্যবসায়ী। সে অনেকগুলো এনজিও চালায়, আশ্রম ও খুলেছে একটি, সেখানেই সে অনাথ শিশুদের সাথে থাকে আর তাদের মধ্যেই খুঁজে বেড়ায় তার মা কে। কারণ সে জানে, একদিন ঠিক তার মা তার কাছে ফিরবে, সেই রূপে না হলেও অন্য রূপে।।


এই বিভাগের আরো খবর
https://www.kaabait.com